বেইমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের শহর মুর্শিদাবাদ......

সারা বাংলা তথা ভারতীয় উপমহাদেশে যে কটি অঞ্চলকে ইতিহাসের আঁতুড়ঘর বলে ধরা যায় তার মধ্যে মুর্শিদাবাদ অন্যতম ।
মুর্শিদাবাদ ,নামটা শুনলেই মনে পড়ে যায় নবাবী আমল আর বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস।
বাংলা বিহার উড়িষ্যার সে দিনের রাজধানী মুর্শিদাবাদ শহরের প্রতিটি বাঁকে রয়েছে বেইমানি,নিষ্ঠুরতা,লাম্পট্য আর মানবতার চরম অবমাননার ইতিহাস ।
আমি প্রথম মুর্শিদাবাদ যাই ১৯৭২ সালে বাবা মায়ের সাথে, মায়ের কাছে মুর্শিদাবাদের ইতিহাসের গল্প শুনতে শুনতে । আমি তখন নেহাত ই বালক,কিন্তু সেই সময় থেকেই ইতিহাসের প্রতি এক ভালবাসা তৈরি হয়, তারপর থেকে ইতিহাসের টানে বার বার ছুটে গেছি এই শহরে ।
আজ এই শহরের ইতিহাস নিয়ে দু একটি কথা বলি ।
সপ্তম শতাব্দীতে রাজা শশাঙ্কের রাজধানী কর্ণ-সুবর্ণ ছিল মুর্শিদাবাদে। মুসলমান শাসনের সময়েও দীর্ঘদিন মুর্শিদাবাদ ছিল বাংলার রাজধানী।
১৭০৪ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদকুলি খাঁ সুবেবাংলার রাজধানী ঢাকা থেকে সরিয়ে ভাগীরথীর পূর্ব তীরে অবস্থিত মুখসুদাবাদ গ্রামে নিয়ে আসেন। পরে তা হয়ে ওঠে সমৃদ্ধ শহর। মুর্শিদকুলি খাঁর নাম অনুসারে ওই শহরের নাম হয় ‘মুর্শিদাবাদ’। ১৭৮৬ খ্রিস্টাব্দে মুর্শিদাবাদ হয় পৃথক জেলা। জেলাটি বর্তমানে প্রেসিডেন্সি বিভাগের অন্তর্গত।
মুর্শিদাবাদের উত্তরে মালদা জেলা ও গঙ্গা নদী। পূর্বে বাংলাদেশ, দক্ষিণে বর্ধমান ও নদীয়া জেলা। পশ্চিমে বীরভূম জেলা, এই জেলার আয়তন ৫, ৩২৪ বর্গ কিমি। জনসংখ্যা ৭১ লাখের কিছু বেশি (২০১১ খ্রিস্টাব্দের হিসাব অনুযায়ী)।
সদর দফতর- বহরমপুর। মহকুমা ৫টি। যথা- বহরমপুর সদর, লালবাগ, কান্দি, জঙ্গিপুর, ডোমকল। নদ-নদী- গঙ্গা, ভাগিরথী, ব্রাহ্মণী, দ্বারকা, ময়ূরাক্ষী, জলঙ্গী।
মুর্শিদকুলি খাঁ ঃ-
মুর্শিদ কুলি খান ছিলেন বাংলার প্রথম নবাব। এছাড়াও বিভিন্ন নথি-পত্র নির্দেশ করে তিনিই মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবের মৃত্যুপরবর্তী প্রথম স্বাধীন নবাব। তার উপর মুঘল সাম্রাজ্যের নামমাত্র আধিপত্য ছিল, সকল ব্যবহারিক উদ্দেশ্যেই তিনি বাংলার নবাব ছিলেন।
তার পরিবার সম্পর্কে কয়েক প্রকার মতভেদ রয়েছে। প্রথম সংস্করণমতে মুর্শিদ কুলি খানকে, হাজি শফি ইসফাহানি নামে ইরানের একজন উচ্চপদস্থ মুঘল কর্মকর্তা ক্রীতদাস হিসেবে ক্রয় করেন। ইসফাহানিই তাকে শিক্ষিত করে তুলেন। ভারতে ফেরার পর তিনি মুঘল সাম্রাজ্যে যোগদান করেন। ১৭১৭ সালে সম্রাট আওরঙ্গজেব তাকে কার্তালাব খান নামে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন ও বাংলার গভর্নর নিযুক্ত করেন। অপর সংস্করনমতে তিনি ছিলেন, মারাঠা জেনারেল মুহাম্মদ কুলি খানের নাতি। কিন্তু সবচেয়ে জনপ্রিয় হলো মুর্শিদ কুলি খান দরিদ্র দাক্ষিণাত্য মালভূমি ওড়িয়া ব্রাহমীয় পরিবারে জন্মগ্রহন করেন। ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি হওয়ার পূর্বেই পারস্যের বণিক ইসফাহান তাকে ক্রয় করে ইসলাম ধর্মে স্থানান্তরিত করেন এবং নাম পরিবর্তন করে মুহাম্মদ হাদী বা মির্জা হাদী রাখেন। তিনি বেরার প্রদেশের দেওয়ান হাজী আব্দুল্লাহ কুরাইশির অধীনে চাকরী নেন। পরবর্তীতে বেরার প্রদেশের দেওয়ান সম্রাট আওরঙ্গজেবের অধীনে চলে আসে।
নবাব আলিবর্দি খাঁঃ-
আলিবর্দি খাঁ বাংলা, বিহার, ওড়িষার নবাব ছিলেন। প্রকৃত নাম মির্জা মুহাম্মদ আলি। তিনি ১৭৪০ সাল থেকে ১৭৫৬ সাল পর্যন্ত নবাব ছিলেন। আলিবর্দি খাঁর বাবা ছিলেন আরব দেশীয় এবং মা তুর্কি। তার পিতার নাম ছিল মির্জা মুহাম্মদ। আরব বংশোদ্ভূত মির্জা মুহাম্মদ আজম শাহের (আওরঙ্গজেবের দ্বিতীয় পুত্র) দরবারের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মির্জা মুহাম্মদের দুই পুত্র - মির্জা আহম্মদ ও মির্জা মুহাম্মদ আলি। মির্জা মুহাম্মদ আলির পূর্ণ বয়স্ক হবার সঙ্গে সঙ্গে আজম শাহ তাকে পিলখানার পরিচালক হিসেবে নিয়োগ দেন। ১৭০৭ এর যুদ্ধে আজম শাহের মৃত্যুর পর চাকরি চলে যাওয়ার মির্জা মুহাম্মদ আলির পরিবার সমস্যার সম্মুখীন হয়। তখন, বাকি জীবনের জন্য তিনি সপরিবারে ১৭২০ সালে বাংলায় চলে আসেন।
তিনি বাংলার নবাব মুর্শিদকুলি খাঁর জামাতা সুজাউদ্দিনের দরবারের পারিষদ ও পরে একটি জেলার ফৌজদার নিযুক্ত হন। ১৭২৭ সালে মুর্শিদকুলি খাঁর মৃত্যুর পর তিনি ও তাঁর অগ্রজ হাজি আহম্মদের বুদ্ধিতে সুজাউদ্দিন বাংলার মসনদে বসেন। খুশি হয়ে সুজাউদ্দিন তাঁকে ‘আলিবর্দি’ উপাধি দিয়ে রাজ্যের ফৌজদার নিযুক্ত করেন। ১৭৩৩ সালে বিহার বাংলার সঙ্গে যুক্ত হলে তিনি বিহারের নায়েব সুবা পদে অভিষিক্ত হন। ১৭৩৯ সালে সুজাউদ্দিনের মৃত্যুর পর নবাব হন তাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁ। কিন্তু বিহারের সুবেদার আলিবর্দী খাঁ তখন অপরিসীম শক্তি ও সামর্থ্যর অধিকারী। অমাত্যবর্গও তাঁর অনুগত। অবশেষে ১৭৪০ সালের ৯ই এপ্রিল মুর্শিদাবাদের কাছে গিরিয়ার যুদ্ধে সরফরাজ খাঁকে পরাজিত করে আলিবর্দি বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাব নিযুক্ত হন।
ইতিহাসবিদ রা কি বলবেন আনি জানি না, কিন্তু আমার ধারনা, যে নবাব সুজাউদ্দিনের স্নেহচ্ছায়ায় আলিবর্দি ক্ষমতার স্বাদ পেয়েছিলেন, তাঁর পুত্র সরফরাজ খাঁর বিরুদ্ধে গিরিয়ার যুদ্ধের মধ্য দিয়েই মুর্শিদাবাদে বেইমানি ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাস শুরু হয়েছিল ।
যাই হোক আলিবর্দি খাঁ ছিলেন অত্যন্ত সুদক্ষ শাসক। তিনি শাসন ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করার জন্য হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেক যোগ্য ব্যক্তিকে গুরুত্বপূর্ণ পদে অধিষ্ঠিত করেন। বর্গিদের অত্যাচারে দেশের মানুষ যখন অতিষ্ট তখন তিনি কঠিন হাতে তাদের দমন করেন। বর্গি প্রধান ভাস্কর পন্ডিতসহ তেইশজন নেতাকে তিনি কৌশলে হত্যা করেন এবং বর্গিদের সঙ্গে সন্ধি স্থাপন করেন। একইভাবে তিনি অর্থনৈতিক উন্নয়নের কথা বিবেচনায় রেখে ইউরোপীয় বণিকদের উচ্ছেদ না করে কৌশলে তাদের দমিয়ে রাখেন। এভাবে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে তিনি দেশে শান্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
আলিবর্দি খাঁর কোনো পুত্রসন্তান ছিল না। তিন কন্যা ঘসেটি বেগম (মেহেরউননেসা), শাহ বেগম ও আমিনা বেগমকে তিনি তাঁর ভাই হাজি মুহম্মদের তিন পুত্রের সঙ্গে বিয়ে দেন। আশি বছর বয়সে বৃদ্ধ নবাব আলিবর্দি ১০ই এপ্রিল ১৭৫৬ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর মৃত্যুর পর ছোট মেয়ে আমিনা বেগমের পুত্র সিরাজউদ্দৌলা বাংলা, বিহার, উড়িষ্যার নবাব নিযুক্ত হন। সিরাজ ছিলেন আলিবর্দির অত্যন্ত প্রিয়পাত্র। আলিবর্দির ইচ্ছা অনুযায়ী সিরাজ নবাব হিসেবে অধিষ্ঠিত হন।

নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা (বাঙালীর মননে বাস করা বাংলার এক ট্র্যাজিক নায়ক) ঃ-
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা বা মির্জা মুহাম্মাদ সিরাজ-উদ-দৌলা ( জন্ম: ১৭৩২ - মৃত্যু: ১৭৫৭) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার শেষ স্বাধীন নবাব। পলাশীর যুদ্ধে তাঁর পরাজয় ও মৃত্যুর পরই ভারতবর্ষে প্রায় ২০০ বছরের ইংরেজ-শাসনের সূচনা হয়।
নবাব সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন বাংলার নবাব আলীবর্দী খান-এর নাতি। আলীবর্দী খানের কোন পুত্র ছিল না। তাঁর ছিল তিন কন্যা। তিন কন্যাকেই তিনি নিজের বড়ভাই "হাজি আহমদ"-এর তিন পুত্র, নোয়াজেশ মোহাম্মদের সাথে বড় মেয়ে ঘসেটি বেগমের, সাইয়েদ আহম্মদের সাথে মেজ মেয়ে এবং জয়েনউদ্দিন আহম্মদের সাথে ছোট মেয়ে আমেনা বেগম-এর বিয়ে দেন। আমেনা বেগমের তিন পুত্র ও এক কন্যা ছিল। পুত্ররা হলেন মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজ-উদ-দৌলা) এবং মির্জা মেহেদী। আলীবর্দী খাঁ যখন পাটনার শাসনভার লাভ করেন, তখন তাঁর তৃতীয়া কন্যা আমেনা বেগমের গর্ভে মির্জা মোহাম্মদ (সিরাজ-উদ-দৌলা)-এর জন্ম হয়। এ কারণে তিনি সিরাজের জন্মকে সৌভাগ্যের লক্ষণ হিসেবে বিবেচনা করে আনন্দের আতিশয্যে নবজাতককে পোষ্যপুত্র হিসেবে গ্রহণ করেন। সিরাজ তার নানার কাছে ছিল খুবই আদরের, যেহেতু তার কোনো পুত্র ছিলনা। তিনি মাতামহের স্নেহ-ভালোবাসায় বড় হতে থাকেন। সিরাজ-উদ-দৌলার জন্মতারিখ বা সাল নিয়ে মতপার্থক্য রয়েছে। তবে অধিক গ্রহণযোগ্য মত হলো সিরাজ-উদ-দৌলা ১৭৩২ সালে জন্মগ্রহণ করেন।
১৭৪৬ সালে আলিবর্দী খান মারাঠাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে গেলে কিশোর সিরাজ তার সাথী হন। আলিবর্দি সিরাজ-উদ-দৌলাকে বালক বয়সেই পাটনার শাসনকর্তা নিযুক্ত করেছিলেন। তাঁর বয়স অল্প ছিল বলে রাজা জানকীরামকে রাজপ্রতিনিধি নিযুক্ত করা হয়। কিন্তু বিষয়টি সিরাজদ্দৌলাকে সন্তুষ্ট করতে পারেনি। তাই তিনি একদিন গোপনে কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচরকে নিয়ে ভ্রমণের নাম করে স্ত্রী লুৎফুন্নেসাকে সঙ্গে নিয়ে মুর্শিদাবাদ থেকে বের হয়ে পড়েন। তিনি সোজা পাটনা গিয়ে উপস্থিত হন এবং জানকীরামকে তাঁর শাসনভার ছেড়ে দেওয়ার আদেশ দেন। কিন্তু নবাবের বিনা অনুমতিতে জানকীরাম তাঁর শাসনভার ছেড়ে দিতে অস্বীকৃতি জানান। দুর্গের দ্বার বন্ধ করে বৃদ্ধ নবাবের কাছে বিস্তারিত তথ্য জানিয়ে দূত পাঠান। অন্যদিকে জানকীরামের আচরণে ভীষণ ক্ষুদ্ধ হয়ে সিরাজদ্দৌলা দুর্গ আক্রমণ করেন। উভয়পক্ষে লড়াই শুরু হয়ে গেলে হতাহতের ঘটনাও ঘটে। ঘটনার সংবাদ পেয়ে আলিবর্দি খাঁ দ্রুত ঘটনাস্থলে এসে পৌঁছান এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক করেন। সেদিনই আলিবর্দি খাঁ দুর্গের অভ্যন্তরস্থ দরবারে স্নেহভাজন দৌহিত্রকে পাশে বসিয়ে ঘোষণা দেন,
“ আমার পরে সিরাজ-উদ-দৌলাই বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার মসনদে আরোহণ করবে। ”
ইতিহাসে এই ঘটনাকে সিরাজ-উদ-দৌলার যৌবরাজ্যাভিষেক বলে অভিহিত করা হয়েছে। এই সময়ে সিরাজ-উদ-দৌলার বয়স ছিল মাত্র সতেরো বছর। তবে তাঁকে সিংহাসনের উত্তরাধিকারী মনোনয়ন করার ঘটনা তাঁর আত্নীয়বর্গের অনেকেই মেনে নিতে পারেনি। অনেকেই তাঁর বিরোধিতা শুরু করেন। এদের মধ্যে ছিলেন আলিবর্দি খাঁর বড় মেয়ে ঘসেটি বেগম এবং তার স্বামী নোয়াজেশ মোহাম্মদ। এছাড়া আলিবর্দী খানের জীবদ্দশায় সিরাজ-উদ-দৌলা ঢাকার নৌবাহিনীর প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এসময় তার অনুজ ভ্রাতা ইকরামউদ্দৌল্লা ছিলেন সামরিক বাহিনীর দায়িত্বে।
সিরাজের নবার হবার অনেক আগে থেকেই মুর্শিদাবাদ এর রাজনীতির আকাশে ছিল ষড়যন্ত্র ,আর বিশ্বাসঘাতকতার মেঘের ঘনঘটা ।
মুর্শিদকুলী খানের জামাতা সুজাউদ্দিন মুহাম্মদ খান ১৭২৭ থেকে ১৭৩৯ পর্যন্ত সুবাহ বাংলার নবাব হিসেবে মুর্শিদাবাদ থেকে বাংলা শাসন করছিলেন। তাঁর সময়ে তাঁর পুত্র সরফরাজ খান ১৭৩৪ থেকে ১৭৪০ পর্যন্ত ঢাকার নায়েব নাজিম এবং ১৭৩৯ থেকে ১৭৪০ পর্যন্ত মুর্শিদাবাদের নবাবের দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় (১৭৩৯-১৭৪০) ঢাকার নায়েব নাজিম হন আবুল ফাত্তাহ খান। প্রসঙ্গত, ১৭১৭ সালে বাংলার রাজধানী মুর্শিদাবাদে স্থানান্তরের সময় থেকেই নবাবগণ মুর্শিদাবাদে থাকতেন আর বাংলাদেশের জন্য তখন থেকেই একজন নায়েব নাজিম নিযুক্ত করা হতো। ১৭৪০ থেকে ১৭৪৪ পর্যন্ত আলীবর্দী খানের ভ্রাতুষ্পুত্র ও জামাতা নওয়াজিশ মুহাম্মদ খান নায়েব নাজিম নিযুক্ত হন। তবে তিনি মুর্শিদাবাদে অবস্থান করে তাঁর সহকারী হোসেন কুলী খান এবং হোসাইন কুলীর সহকারী হোসেন উদ্দিন খানকে (১৭৪৪-১৭৫৪) ঢাকায় দায়িত্ব পালন করান। এ সময় থেকেই আলীবর্দীর ভ্রাতুষ্পুত্র শওকত্জংগ নওয়াজিস মুহাম্মদের বিরোধ দেখা দেয়। এ বিরোধের জের হিসেবে ঢাকায় হোসেন উদ্দিন খান এবং মুর্শিদাবাদে তাঁর কাকা নিহত হন। ঢাকায় হোসেন উদ্দিন খানকে হত্যায় জড়িত ছিলেন আগা সাদেক এবং আগা বাখের। আগা বাখের ছিলেন বাখরগঞ্জের জমিদার এবং তাঁর পুত্র আগা সাদেক। হোসেন উদ্দিন খানের একটি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে আগা সাদেক মুর্শিদাবাদে হোসেন কুলী খান কর্তৃক বন্দী হন। সেখান থেকে ঢাকায় পালিয়ে এসে তিনি হোসেন কুলী খানকে হত্যার পরিকল্পনা করেন। অত্যন্ত সৎ এবং ধার্মিক হোসেন কুলী খানকে রাতের আঁধারে তাঁর প্রাসাদে প্রবেশ করে হত্যা করা হয়। সকাল বেলা ঘটনাটি জানাজানি হয়ে গেলে শহরের বাসিন্দারা একত্রিত হয়ে মারমুখী হয়ে ওঠে এবং আগা বাখের ও তাঁর পুত্রকে আক্রমণ করে। তারা নায়েব নাজিমের পদে নিয়োগের বিষয় বলে পার পাওয়ার চেষ্টা করলে লোকেরা নায়েব নাজিম পদে নিয়োগের সনদ প্রদর্শনের দাবি করে।তা প্রদর্শন না করে তারা তরবারি ধারণ করে। এ অবস্থায় জনতার আক্রমণে আগা বাখের প্রাণ হারায় এবং আগা সাদেক মারাত্মকভাবে আহত হওয়া সত্ত্বেও পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।নোয়াজেশের পরমবন্ধু ছিলেন হোসেন কুলি খাঁ ও রাজবল্লভ। হোসেন কুলি খাঁ ছিলেন নোয়াজেশের ধনভান্ডারের দায়িত্বে। তাঁর হত্যাকান্ডে রাজবল্লভ কিছুটা ভয় পেয়ে যান। তখন তিনি অন্য ষড়যন্ত্র পরিকল্পনা করেন। নোয়াজেশ নিঃসন্তান ছিলেন বলে তিনি সিরাজের ছোটভাই মির্জা মেহেদীকে পোষ্যপুত্র গ্রহণ করেছিলেন। মির্জা মেহেদী নোয়াজেশের জীবদ্দশাতেই মারা যান। কিন্তু তাঁর অল্পবয়স্ক পুত্র সন্তান ছিল। রাজবল্লভ তাকেই সিংহাসনে বসিয়ে ঘসেটি বেগমের নামে স্বয়ং বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি করার স্বপ্ন দেখছিলেন। এইরকম দুর্যোগময় পরিস্থিতিতেই আলিবর্দি খাঁ ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল মৃত্যুবরণ করেন।
চারদিকে শুরু হয় প্রচন্ড অরাজকতা এবং ষড়যন্ত্র। ইংরেজরা নবাবের অনুমতি না নিয়েই কলকাতায় দুর্গ সংস্কার করা শুরু করে। রাজবল্লভ ঘসেটি বেগমকে সহায়তা করার জন্য পুত্র কৃষ্ণবল্লভকে ঢাকার রাজকোষের সম্পূর্ণ অর্থসহ কলকাতায় ইংরেজদের আশ্রয়ে পাঠান। এ রকম পরিস্থিতিতেই ১৭৫৬ সালের ১০ এপ্রিল শাহ কুলি খান মির্জা মোহাম্মদ হায়বৎ জং বাহাদুর (সিরাজ-উদ-দৌলা) বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার সিংহাসনে আরোহণ করেন।


সিরাজ-উদ-দৌলা, যার অর্থ ‘রাষ্ট্রের প্রদীপ‘। এটি সিরাজের আসল নাম নয়, এটি ছিল প্রিয় দাদু আলিবর্দি খাঁর থেকে পাওয়া উপাধি। তাঁর মূল নাম ছিল মির্জা মহম্মদ। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক স্যার যদুনাথ মুখোপাধ্যায়ের তথ্য অনুযায়ী সিরাজের জন্ম সম্ভবতঃ ১৭৩৩ সালের মার্চ মাসের প্রথমে বা মাঝামাঝি ।
১৭৫৬ সালের ১৫ ই এপ্রিল সিরাজ-উদ-দৌলা সিংহাসনে বসেছিলেন। যদিও তখন তাঁর বয়স মাত্র ২৩ বছর। তবে সিরাজ-উদ-দৌলা অনেক আগে থেকেই দাদুর কাছে নানা দায়িত্ব পেয়ে নিজের উৎকর্ষতা প্রমান করেছিলেন। ১৭৪৬ সালে মাত্র ১৩ বছর বয়সে মির্জা ইরাজ খানের কন্যা লুৎফুন্নেসার সাথে বিবাহ করার পর ১৭৪৮ সালে সিরাজ-উদ-দৌলার পিতা জইনুদ্দিন আফগানদের হাতে নিহত হন। সেই প্রতিশোধ সিরাজ-উদ-দৌলা নিয়েছিলেন ১৭৪৮ সালে আফগান বিদ্রোহ দমন করে। ১৭৪৯ সালে উড়িষ্যায় করেছিলেন বর্গি দমন। এই সময় সিরাজ নবাব আলিবর্দির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন, যা সিরাজের এক বিরাট ভুল। কিন্তু তবুও ১৭৫০ সালে পাটনায় বিপদে পড়লে সিরাজ-উদ-দৌলাকে প্রানে বাঁচিয়েছিলেন দাদু আলিবর্দি খাঁ। বৃদ্ধ আলিবর্দি খাঁ সিরাজকে আগলে রেখেছিলেন পরম স্নেহে। তাঁকে বানিয়ে দিয়েছিলেন হীরাঝিল আর মনসুরগঞ্জ প্রাসাদ। আর এখানেই ঘটেছিল সিরাজ-উদ-দৌলার অধঃপতন। দিবারাত্রি মদ্যপান আর হারেমে বুঁদ হয়ে গিয়েছিলেন। বিপদ বুঝে আলিবর্দি খাঁ সিরাজ-উদ-দৌলাকে মসনদে বসানোর কথা ভাবলেন। কিন্তু তাঁর আগেই মারা গেলেন তিনি। তবে মারা যাবার আগে ১০ লাইনের একটি চিঠি লিখে গিয়েছিলেন তিনি। যেই চিঠির প্রতিটি বাক্য সিরাজ-উদ-দৌলা মেনে চলেছিলেন আমৃত্যু। কথিত আছে পবিত্র কোরান ছুঁয়ে শপথ নিয়ে আর কখনো মদ-হারেম মুখো হননি।
এই ঘটনাটা সিরাজের ধর্মপ্রান মানসিকতার কথা প্রমান করে । বিশেষ করে একজন ইসলাম ধর্মালম্বী মানুষের পবিত্র কোরান ছুঁয়ে শপথ যে সম্পুর্ন বিশ্বাসযোগ্য তা তিনি বিশ্বাস করতেন। অবশ্য এই অন্ধবিশ্বাস ই তাঁর জীবনে বিপদ ডেকে এনেছিল। সে কথা পরে বলছি ।
যাই হোক,আলিবর্দি খাঁ ফরাসি ও ইংরেজদের কাছে যথেষ্ট সম্মান ও উপঢৌকন পেতেন। সিরাজও সেটা পেতে লাগলেন। শক্ত হাতে রাজ্যের হাল ধরেন। মিরজাফরকে সরিয়ে মিরমদনকে বকশি ও মদনলালকে পেশকার পদে বসান। মিরজাফরের সাথে দূরত্বের সুচনা হল। মতিঝিলে ভেঙ্গে দিলেন মাসি ঘসেটি বেগমের রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের আখড়া। সিরাজ-উদ-দৌলা আরেক শত্রু বিহারের শওকত জঙ্গের আনুগত্যও আদায় করলেন। ইংরেজরা সিরাজ-উদ-দৌলার দুতকে অপমান করলে কলকাতায় গিয়ে ইংরেজদের শায়েস্তাও করেন। স্বয়ং গভর্নর ড্রেক পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। দূরত্ব তৈরি হয় ইংরেজদের সাথেও। মসনদে বসে কয়েকমাসের ভিতরে এতগুলি সফল কাজও তিনি করেছিলেন। তবু কিন্তু এরপরেই সিরাজ-উদ-দৌলা আবার এক ভুল করে বসলেন। পরাজিত ইংরেজদের তাড়িয়ে না দিয়ে সকল বন্দীদের মুক্ত করে দেন। ফলে ১৭৫৭ সালের ২ রা জানুয়ারি অ্যাডমিরাল ওয়াটসন মাদ্রাজ থেকে আরও সৈন্য এনে কলকাতা পুনর্দখল করল। সিরাজ-উদ-দৌলা আবার ইংরেজদের সাথে লড়াইয়ের ময়দানে নামলেন। কিন্তু লর্ড ক্লাইভের কৌশলের কাছে পরাজিত হয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা বাধ্য হলেন ইংরেজদের সাথে সন্ধি করতে, ফলে আবার মিত্রতা হল। কিন্তু এই মিত্রতার ভিতরেই জন্ম নিল ধংসের বীজ। ফরাসিদের আক্রমন করল ইংরেজ, সিরাজ-উদ-দৌলা তাতে সাহায্য করলেন। কিন্তু ফরাসিরা আসলেই ছিল নবাবের বন্ধু। কিন্তু সন্ধির কারনে সিরাজ-উদ-দৌলা নিজ হাতে নিজের কবর খুঁড়ে বিপদ দেকে আনলেন।
ফরাসিদের বাংলা ছেড়ে যাবার নির্দেশ দিলেন সিরাজ-উদ-দৌলা। ফলে একদিকে মিত্র ফরাসিদের হারালেন, অন্যদিকে মিরজাফর, ইয়ারলতিফ, জগৎশেঠরা ইংরেজদের সাথে যুক্ত হয়ে শত্রুর সংখ্যা বেড়ে গেল। ইংরেজরা দেখলেন, সিরাজের আত্মীয়, অভিজাত, বুদ্ধিমান, শিক্ষিত, পণ্ডিত ও ক্ষমতাশালী মিরজাফরকে নবাব করলে তাঁদের প্রভুত্ব বিস্তারে সুবিধা হবে। তাই শুরু হল চক্রান্ত। পাঞ্জাবী ব্যাবসায়ি উমিচাঁদও যুক্ত হয়ে গেলেন এই চক্রান্তে। শুরু হল ইংরেজ ও সিরাজ-উদ-দৌলা দ্বন্দ্ব।ঠিক এইখানে একটি ঘটনা উল্লেখ করার প্রয়োজন বোধ করছি । এই চক্রান্তের কথা জানতে পেরে সিরাজ মীরজাফরের সাথে এক আলোচোনায় বসেন।আলোচনায় মীরজাফর পবিত্র কোরান ছুঁয়ে বলেন যে তিনি জীবিত থাকতে বাংলার স্বাধীনতা ক্ষুণ্ণ হতে দেবেন না ।
এই ঘটনা টি সিরাজের সমস্ত আস্থা ফিরিয়ে আনে, তাঁর ধর্মপ্রান মন কখনো কল্পনাতেই আনতে পারেনি
যে মিরজাফর একজন মুসলিম কোরান ছুঁয়ে শপথ করার পরেও চক্রান্তের শরিক হবেন। ফলে সিরাজ-উদ-দৌলা মিরজাফরকে দিলেন সেনাপতির দায়িত্ব। হয়ে গেল ইতিহাসের আরেক চরমতম ভুল।
সিরাজ-উদ-দৌলা যখন সিংহাসনে আরোহণ করেন, তখন থেকেই কলকাতায় ইংরেজদের প্রতাপ ধীরে ধীরে বাড়তে থাকে। তিনি তাদেরকে দমন করার জন্য কাশিমবাজারের কুঠিয়াল ওয়াটসনকে কলকাতার দুর্গপ্রাচীর ভেঙে ফেলতে ও ভবিষ্যতে নবাবের পূর্বানুমতি ছাড়া এ ধরণের কাজ না করার নির্দেশ দেন। কিন্তু আদেশ তাঁর কাজ বহাল রাখলেন। সিরাজ-উদ-দৌলা তখন বুঝতে পারলেন গৃহবিবাদের সুযোগ নিয়ে ইংরেজরা উদ্ধত স্বভাবের পরিচয় দিচ্ছে। সুতরাং প্রথমেই ঘসেটি বেগমের চক্রান্ত চূর্ণ করার জন্য তিনি সচেষ্ট হন। তিনি মতিঝিল প্রাসাদ অধিকার করে ঘসেটি বেগমকে মুর্শিদাবাদ নিয়ে আসার ব্যবস্থা করেন। মতিঝিল অধিকার করে নবাব কাশিমবাজারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। ২৭ মে তাঁর সেনাবাহিনী কাশিমবাজার দুর্গ অবরোধ করেন। তিনি কাশিমবাজার দুর্গের কুঠিয়াল ওয়াটসনকে দরবারে হাজির হয়ে তাঁর নির্দেশ যথাযথভাবে পালন করার জন্য অঙ্গীকারপত্র লিখতে বলেন। ওয়াটসন এই অঙ্গীকারপত্র লিখতে বাধ্য হন।
একই বছর ১৮ জুন সিরাজ-উদ-দৌলা কলকাতা আক্রমণ করেন। তুমুল যুদ্ধ হওয়ার পর ২০ জুন কলকাতা দুর্গ সিরাজের দখলে আসে। তিনি দুর্গ প্রবেশ করে এবং দরবারে উপবেশন করে উমিচাঁদ ও কৃষ্ণবল্লভকে সেখানে উপস্থিত হওয়ার আদেশ দেন। এরপর সেনাপতি মানিকচাঁদের হাতে দুর্গের শাসনভার ছেড়ে দিয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা রাজধানীতে ফিরে আসেন। ১২ জুলাই তিনি রাজধানীতে প্রত্যাবর্তন করেন।
দিল্লীর বাদশা পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি সনদ পাঠালেন। শওকত নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করেন। ইংরেজরা এই সংবাদ পেয়ে গোপনে শওকত জঙ্গের সাথে মিত্রতার করার চেষ্টা করতে থাকে। অপরদিকে মাদ্রাজের ইংরেজ দরবার কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে প্রধান সেনাপতি করে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠায়। সিরাজ-উদ-দৌলাও শওকত জঙ্গকে প্রতিরোধ করার জন্য রওনা হন। পথিমধ্যে নবাবগঞ্জ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে শওকত নিহত হন। সিরাজ-উদ-দৌলা মোহনলালের হাতে পূর্ণিয়ার শাসনভার অর্পণ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।
ক্লাইভ ও ওয়াটসন পলতায় পৌঁছেই কলকাতা অভিমুখে রওনা হন। প্রায় বিনাযুদ্ধে তারা কলকাতা দুর্গ জয় করে নেন। এর আগে ক্লাইভ ও ওয়াটসন কলকাতায় এসে সিরাজ-উদ-দৌলার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এবং সিরাজ-উদ-দৌলা তাতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা শর্ত ভঙ্গ করে কলকাতা আক্রমণ করে। সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁর মন্ত্রীদের কুচক্রের বিষয়ে শংকিত হয়ে পড়েন এবং এ কারণে ইংরেজদের সাথে একটি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। তাই ইংরেজদের সকল দাবিতে রাজি হয়ে তিনি ১৭৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে এই সন্ধি 'আলিনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত। কিন্তু ইংরেজরা তাদের মতিগতির কোন পরিবর্তন করল না। মূলতঃ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ফরাসিদের সঙ্গে। কিন্তু সিরাজদ্দৌলা ফরাসিদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। আলিনগরের (কলকাতা) সন্ধির প্রতিশ্রুতি পালনে নবাবকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।
পলাশী যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের দরুন। আর এ ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিল মীর জাফর, রায় দুর্লভ, জগৎ শেঠ, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, ইয়ার লতিফ, মহারাজ নন্দকুমার, ঘসেটি বেগমসহ অনেকেই। নবাব আলীবর্দী ছিলেন অপুত্রক। যে কারণে তার ভগ্নিপতি মীর জাফরের ইচ্ছা ছিল নবাব হবার। কিন্তু আলীবর্দী যখন সিরাজদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মনোনয়ন দেন তখন থেকেই শুরু হয় মীরজাফরের ষড়যন্ত্র। মাসি ঘসেটি বেগমও সিরাজকে নবাব হিসেবে মনোনয়ন প্রদান মেনে নিতে পারেননি। এ সময় রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণ বল্লভকে নিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসীন নবাব সিরাজদ্দৌলার প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হয়। অপরিমিত সরকারি রাজস্ব লুণ্ঠন করে নবাবের ভয়ে ভীত কৃষ্ণবল্লভ আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতায় ইংরেজদের কাছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা ইংরেজদের প্রতি আহবান জানান, তারা যেন কৃষ্ণবল্লভকে ফেরৎ পাঠান। ইংরেজরা অগ্রাহ্য করেন নবাবের আদেশ। সিরাজদ্দৌলা ক্ষুব্ধ হয়ে কাশিমবাজার কুঠি ও কলকাতা আক্রমণ করেন এবং তা দখল করে নেন। এ সময় ‘অন্ধকূপ’ হত্যাকাণ্ড নামে একটি ঘটনা প্রচার করে নবাবের চরিত্রে কালিমা লেপন করা হয়।
উপমহাদেশে প্রকৃত ইতিহাস যে কোনো বিষয়েই পাওয়া কঠিন। কারন এখানে ইতিহাস রচিত হয় লেখকের সমর্থনের উপরে। যার পক্ষে লেখা হয় তাকে দেবতা আর বিরুদ্ধবাদী হয় মানুষরুপী শয়তান। মীর জাফর তার তার প্রমান।
সিরাজ-উদ-দৌলার ব্যক্তিগত চরিত্র সমালোচনার উদ্ধে নয়। নবাব পরিবারের এক গৃহশিক্ষক গোলাম হোসেনের মতে ‘সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন নিষ্ঠুর, ব্যভিচারী, লম্পট, অর্থলোলুপ ও মদ্যপ‘। ইংরেজ ও ফরাসিদের চোখেও সিরাজ-উদ-দৌলা ছিলেন ‘নিষ্ঠুর‘। সমকালীন লেখক ভোলানাথ চন্দ্র সিরাজ-উদ-দৌলাকে বলেছেন ‘নিষ্ঠুর ও ব্যভিচারী‘। কিন্তু আবার কিছু ঐতিহাসিকেরা এও বলেন, ‘সিরাজ-উদ-দৌলা আর যাই হোক, কাপুরুষ ছিলেন না। নিজ সাম্রাজ্য রক্ষায় আমৃত্যু সচেষ্ট ছিলেন। মিরজাফরের মত তিনি দেশকে ইংরেজদের হাতে তুলে দেননি।
আমার ধারনা অল্প বয়স, অল্প শিক্ষা, অভিভাবকহীনতা ,মানুষ চিনতে পারার অক্ষমতা, অন্ধবিশ্বাস, ও নিজেদের ঘরের শত্রুদের জন্য তিনি ইংরেজদের কাছে পরাজিত হয়েছিলেন‘। আর তাই সিরাজ-উদ-দৌলা যাবতীয় ব্যক্তিগত দোষ থাকলেও তাঁর ধর্ম প্রান মানসিকতা শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত বাংলার স্বাধীনতা রক্ষার চেষ্টায় তিনি ইতিহাসের পাতায় ও বাঙালীর মননে সসম্মানেই আছেন বাংলার এক ট্র্যাজিক চরিত্র হিসাবে।

বাংলার ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় হলো পলাশী যুদ্ধ। পলাশী যুদ্ধে নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার পরাজয় মানে বাংলার স্বাধীনতা হারানো। শুধু কী বাংলার স্বাধীনতা বিনষ্ট হওয়া? এর ফলে বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার স্বাধীনতা বিনষ্ট হয়। এরপর ক্রমান্বয়ে সমগ্র ভারতবর্ষই স্বাধীনতা হারায়।
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলা, বিহার ও উরিষ্যার স্বাধীন নবাব সিরাজ-উ-দৌলা ইংরেজদের সাথে দেশ রক্ষার যুদ্ধে লিপ্ত হন। কিন্তু ক্ষমতার লোভে এদেশীয় মীর জাফর, রাজবল্লভ, রায় দুর্লভ, উর্মি চাঁদ, জগৎশেঠেরা প্রতারণা করে সিরাজকে পরাজিত করে। আর নিষ্ঠুর ইংরেজদের নির্দেশে এবং মিরনের আদেশে মোহম্মদী বেগ, বাংলার মহানায়ক সিরাজকে শহীদ করে ২ জুলাই ১৭৫৭। শুধু সিরাজকে শহীদ করেই ক্ষান্ত হয়নি এ নিষ্ঠুর চক্রটি। তারা সিরাজ পরিবারটিকেই তছনছ করে ফেলে।
আজকের পর্বে পলাশীর যুদ্ধের কথা বলি । সেদিন কি ঘটেছিল পলাশীর আমবাগানে ......
১৭৫৭ সালের ২৩ জুন বাংলার ইতিহাসের এক পরাজয় ও গ্লানিময় দিন। এই দিনই পলাশীর যুদ্ধে বাংলা হারিয়েছে তার স্বাধীনতা। গঙ্গা-ভাগীরথীর উত্তর-পশ্চিম তীরেই এই পলাশীর প্রান্তর। বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার রাজধানী তখন মুর্শিদাবাদ। মুর্শিদাবাদ থেকে পলাশীর দুরত্ব ৫০ কিমি। মুর্শিদাবাদ ও পলাশি দু’টোই ভাগীরথীর তীরে অবস্থিত। ভাগীরথীর তীরে পলাশীর প্রান্তরে যুদ্ধের নামে যে বিশ্বাসঘাতকতার নাটক মঞ্চস্থ হয়েছিল তারই পরিণতিতে বাংলার স্বাধীনতা-সূর্য ১৯০ বছরের জন্য অস্তমিত হয়।
নজরুল ইসলাম তার ‘কাণ্ডারী হুশিয়ার!’ কবিতায় লিখেছেন,
“কান্ডারী! তব সম্মুখে ঐ পলাশীর প্রান্তর,
বাঙালীর খুনে লাল হল যেথা ক্লাইভের খঞ্জর!
ঐ গঙ্গায় ডুবিয়াছে হায়, ভারতের দিবাকর!
উদিবে সে রবি আমাদেরি খুনে রাঙিয়া পূনর্বার।
১৯২৬ সালে কবি এ কবিতাটি যখন লেখেন তখন ভারত পরাধীনতার ১৭০ বছর উদযাপন করছে! নজরুল এ কবিতাটি রচনা করার দুই দশক পরে ভারত তার হৃত স্বাধীনতা ফিরে পেয়েছে।
আবার ফিরে যাই ১৭৫৭ তে । আগেই বলেছি ,পলাশী যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল সিরাজের বিরুদ্ধে ইংরেজদের ষড়যন্ত্রের দরুন। আর এ ষড়যন্ত্রে যোগ দিয়েছিল মীর জাফর, রায় দুর্লভ, জগৎ শেঠ, মহারাজ কৃষ্ণচন্দ্র, ইয়ার লতিফ, মহারাজ নন্দকুমার, ঘসেটি বেগমসহ অনেকেই। নবাব আলীবর্দী ছিলেন অপুত্রক। যে কারণে তার ভগ্নিপতি মীর জাফরের ইচ্ছা ছিল নবাব হবার। কিন্তু আলীবর্দী যখন সিরাজদ্দৌলাকে নবাব হিসেবে মনোনয়ন দেন তখন থেকেই শুরু হয় মীরজাফরের ষড়যন্ত্র। সিরাজের মাসি ঘসেটি বেগমও সিরাজকে নবাব হিসেবে মনোনয়ন প্রদান মেনে নিতে পারেননি। এ সময় রাজবল্লভের পুত্র কৃষ্ণ বল্লভকে নিয়ে সদ্য ক্ষমতায় আসীন নবাব সিরাজদ্দৌলার প্রত্যক্ষ সংঘাত শুরু হয়। অপরিমিত সরকারি রাজস্ব লুণ্ঠন করে নবাবের ভয়ে ভীত কৃষ্ণবল্লভ আশ্রয় নিয়েছিলেন কলকাতায় ইংরেজদের কাছে। নবাব সিরাজদ্দৌলা ইংরেজদের প্রতি আহবান জানান, তারা যেন কৃষ্ণবল্লভকে ফেরৎ পাঠান। ইংরেজরা অগ্রাহ্য করেন নবাবের আদেশ। সিরাজদ্দৌলা ক্ষুব্ধ হয়ে কাশিমবাজার কুঠি ও কলকাতা আক্রমণ করেন এবং তা দখল করে নেন। এ সময় ‘অন্ধকূপ’ হত্যাকাণ্ড নামে একটি ঘটনা ইতিহাসে উল্লেখ আছে।অবশ্য পরবর্তী কলে ঘটনাটি মিথ্যে প্রমানিত হয় ।যাই হোক, ইংরেজদের বিপর্যয়ের খবর পৌঁছায় ইংরেজদের মাদ্রাজ কুঠিতে। সে সময় মাদ্রাজ থেকে কলকাতায় পাঠানো হয় এডমিরাল ওয়াটসন ও কর্ণেল ক্লাইভকে।
দিল্লীর বাদশা পূর্ণিয়ার নবাব শওকত জঙ্গকে বাংলা-বিহার-উড়িষ্যার নবাবি সনদ পাঠালেন। শওকত নবাব সিরাজ-উদ-দৌলার বিরুদ্ধে যুদ্ধযাত্রার আয়োজন করেন। ইংরেজরা এই সংবাদ পেয়ে গোপনে শওকত জঙ্গের সাথে মিত্রতার করার চেষ্টা করতে থাকে। অপরদিকে মাদ্রাজের ইংরেজ দরবার কর্নেল রবার্ট ক্লাইভকে প্রধান সেনাপতি করে কলকাতা পুনরুদ্ধারের জন্য পাঠায়। সিরাজ-উদ-দৌলাও শওকত জঙ্গকে প্রতিরোধ করার জন্য রওনা হন। পথিমধ্যে নবাবগঞ্জ নামক স্থানে উভয়পক্ষ মুখোমুখি যুদ্ধে লিপ্ত হয়। যুদ্ধে শওকত নিহত হন। সিরাজ-উদ-দৌলা মোহনলালের হাতে পূর্ণিয়ার শাসনভার অর্পণ করে রাজধানীতে ফিরে আসেন।
ক্লাইভ ও ওয়াটসন পলতায় পৌঁছেই কলকাতা অভিমুখে রওনা হন। প্রায় বিনাযুদ্ধে তারা কলকাতা দুর্গ জয় করে নেন। এর আগে ক্লাইভ ও ওয়াটসন কলকাতায় এসে সিরাজ-উদ-দৌলার কাছে সন্ধির প্রস্তাব পাঠিয়েছিলেন এবং সিরাজ-উদ-দৌলা তাতে রাজি হয়েছিলেন। কিন্তু ইংরেজরা শর্ত ভঙ্গ করে কলকাতা আক্রমণ করে। সিরাজ-উদ-দৌলা তাঁর মন্ত্রীদের কুচক্রের বিষয়ে শংকিত হয়ে পড়েন এবং এ কারণে ইংরেজদের সাথে একটি সম্পর্ক স্থাপনের জন্য চেষ্টা চালাতে থাকেন। তাই ইংরেজদের সকল দাবিতে রাজি হয়ে তিনি ১৭৫৭ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি ইংরেজদের সাথে একটি সন্ধিপত্রে স্বাক্ষর করেন। ইতিহাসে এই সন্ধি 'আলিনগরের সন্ধি' নামে পরিচিত। কিন্তু ইংরেজরা তাদের মতিগতির কোন পরিবর্তন করল না। মূলতঃ তাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল ফরাসিদের সঙ্গে। কিন্তু সিরাজদ্দৌলা ফরাসিদের বেশি প্রাধান্য দিচ্ছিলেন। আলিনগরের (কলকাতা) সন্ধির প্রতিশ্রুতি পালনে নবাবকে যথেষ্ট ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিল।
সব ধরনের গোলমাল মোটামুটি শান্ত হওয়ার পর সিরাজ-উদ-দৌলা সেনাপতিদের অপকর্মের বিচার শুরু করেন। মানিকচন্দ্রকে কারাবন্দি করা হয়। এটা দেখে রাজবল্লভ, জগৎশেঠ ও মীরজাফর সবাই ভীত হয়ে গেলেন। স্বার্থ রক্ষার জন্য জগৎশেঠের মন্ত্রণাভবনে মিলিত হয়ে তাঁরা ইংরেজদের সাহায্যে নবাবকে সিংহাসনচ্যুত করে মীরজাফরকে সিংহাসনে বসাবার চক্রান্ত শুরু করলেন। ইয়ার লতিফ গোপনে ওয়াটসনের সঙ্গে মিলিত হয়ে কুমন্ত্রণা দিলেন যে, সিরাজদ্দৌলা খুব শীঘ্রই ইংরেজদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন। আর এই কারণেই তিনি পলাশীতে শিবির স্থাপন করেছেন। ক্লাইভ এরপর তাঁর সেনাবাহিনীর অর্ধেক লুকিয়ে রেখে বাকিদের নিয়ে কলকাতায় পৌঁছালেন। আর নবাবকে পত্র লিখলেনঃ

আমরা সেনাদল উঠিয়ে আনলাম আর আপনি পলাশীতে ছাউনি গেড়ে বসেছেন?

সিরাজদ্দৌলা সরল বিশ্বাসেই মীরজাফরকে পলাশী থেকে ছাউনি উঠিয়ে মুর্শিদাবাদ চলে যাবার আদেশ দিলেন। মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছামাত্রই স্ক্রাফটন তার সঙ্গে মিলিত হয়ে গোপন সন্ধির খসড়া লিখে নিলেন। ১৭ মে কলকাতার ইংরেজ দরবারে এই গোপন সন্ধিপত্রের খসড়া নিয়ে আলোচনা হয়। মীরজাফরের স্বাক্ষরের জন্য এই গোপন সন্ধিপত্র ১০ জুন তার কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু এই গুপ্ত বৈঠক গোপন থাকলো না। ক্লাইভ যুদ্ধের প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করলেন। এদিকে গোপন সন্ধিপত্রের সংবাদ জানতে পেরে সিরাজদ্দৌলা মীরজাফরকে বন্দি করার ব্যবস্থা নিলেন। ওয়াটসন রাজধানী থেকে পালিয়ে গেলেন।
১৭৫৭ খিস্টাব্দের ১২ জুন কলকাতা ও চন্দননগরে ইংরেজ সেনা একত্রিত হয় এবং ১৩ জুন ব্রিটিশ বাহিনী যুদ্ধযাত্রা করে। গোলাবারুদ নিয়ে গোরারা দুইশত নৌকায় যাত্রা করে আর কালো আদমীরা গঙ্গাতীরের বাদশাহী রাস্তা বরাবর অগ্রসর হতে থাকে, পথে হুগলী ও কাঠোয়ার দুর্গে হুগুলীতে নবাব সেনারা ইংরেজদের পথ রোধ করেনি, মুর্শিদাবাদের গুপ্তমন্ত্রণা হুগলীর ফৌজদারকে কর্তব্যভ্রষ্ট করেছিল। সিরাজ-উদ-দৌলা ঐ পরিস্থিতিতে মীর জাফরকে বন্দি করার সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে তাকে রাজ সদনে আহ্বান করেন। সিরাজউদ্দৌলা ভেবেছিলেন, ইসলামের নামে, আলিবর্দীর নামে, স্বাধীনতার নামে মীর জাফরের বিভ্রান্তি দূর করবেন। তিনি মীর জাফরকে ক্ষমা প্রদর্শন করে, আল্লাহর নামে, মোহাম্মদ (সা.) এর নামে, ইসলামের গৌরবের নামে, নবাব আলিবর্দীর বংশ মর্যাদার দোহাই দিয়ে মীরজাফরকে ফিরিঙ্গী সংসর্গ ত্যাগ করে তার সঙ্গে আসার জন্য উদাত্ত আহ্বান জানান। আবার কোরআন শরীফ আনা হয়, এবার পরম পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কোরআন শরীফ মাথায় নিয়ে অন্নদাতা মুসলমান নবাবের কাছে মুসলমান সেনাপতি জানুপেতে শপথ করেন আল্লাহর নামে।
“পয়গম্ববরের নামে ধর্মশপথ করিয়া অঙ্গীকার করিতেছি, যাবজ্জীবন মুসলমান সিংহাসন রক্ষা করিব, প্রাণ থাকিতে বিধর্মী ফিরিঙ্গীর সহায়তা করিব না। এভাবে মীর জাফর সিরাজউদ্দৌলার সন্দেহ দূর করে তাকে প্রতারণা করলেন। হিন্দু যে ব্রাহ্মণের পদস্পর্শ করিয়া মিথ্যা বলিতে পারে, সে কথা সিরাজউদ্দৌলা বিশ্বাস করিতেন না; সে জন্য একবার উমাচরনের (উর্মিচাদ) ধর্ম শপথে প্রতারিত হইয়াছিলেন। মুসলমান যে কোরআন শরীফ মাথায় লইয়াও মিথ্যা কথা বলিতে সাহস করিবে, তাহা বিশ্বাস করিতে না পারিয়া সিরাজউদ্দৌলা আবার প্রতারিত হইলেন। লোক বলে, সিরাজ পরম পাষ-, ধর্মাধর্ম বিচারহীন, উচ্ছৃংখল যুবক, তাহা হইলে হয়ত তাহার পক্ষে ভালো হইত। তাহা হইলে হয়ত হিন্দু ব্রাহ্মণের পদস্পর্শ করিয়া ফিরিঙ্গী বাইবেল চুম্বন করিয়া এবং মুসলমান কোরআন মাথায় লইয়া তাহাকে যাহা ইচ্ছা তাহাই বিশ্বাস করাইতে পারিতেন না।” (অক্ষয় কুমার মৈত্রেয়, সিরাজউদ্দৌলা)
গৃহবিবাদের মীমাংসা করে তিনি রায়দুর্লভ, ইয়ার লতিফ,মীরজাফর, মীরমদন, মোহনলাল ও ফরাসি সেনাপতি সিনফ্রেঁকে সৈন্য চালানোর দায়িত্ব দিয়ে তাঁদের সঙ্গে যুদ্ধযাত্রা শুরু করলেন।
বিদেশী এবং দেশী ষড়যন্ত্রকারীদের চক্রান্তের কারণে ১৭৫৭ সালের ২৩ জুন পলাশীর যুদ্ধ একটি প্রহসন ছাড়া কিছুই নয়। এ যুদ্ধ ছিল পরিকল্পিত ও সাজানো।পলাশী যুদ্ধে নবাবের পদাতিক সৈন্য ছিল ৫০ হাজার। ১৫ হাজার অশ্বারোহী সেনা ছিল। আর ছিল ৫৩ টি কামান। অন্যদিকে ইংরেজ বাহিনীর ছিল ৮শ’ ইংরেজ সেনাসহ অন্যান্য ২২শ’ সেনা। শক্তি বিচারে ইংরেজ বাহিনীর জয়ের কোন আশাই ছিল না। কিন্তু বিশ্বাসঘাতকদের অধীনেই ছিল নবাব বাহিনীর অধিকাংশ সৈন্য। সেনাপতি মীর জাফর আলী খানের অধীনে ছিল নবাবের ৫০ হাজার সেনাবাহিনীর ৩৫ হাজার সৈন্য। তিনি পলাশীর যুদ্ধে একটি গুলি ছোড়ারও নির্দেশ দেননি, ২ হাজার মসনবদার ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভও একই ভূমিকা পালন করেন।
বাহিনী ক্লাইভের নেতৃত্বে ১৬ জুন ১৭৫৭ তারিখে পাটুলিতে এসে উপস্থিত হন। ১৭ জুন তারা কাটোয়া দখল করে নেয়। ২২ জুন ভাগীরথী নদী পার হয়ে ইংরেজ বাহিনী আশ্রয় নেয় পলাশীর আম্রকুঞ্জে।বেলা আটটার সময় হঠাৎ করেই মীর মদন ইংরেজবাহিনীকে আক্রমণ করেন। তাঁর প্রবল আক্রমণে টিকতে না পেরে ক্লাইভ তাঁর সেনাবাহিনী নিয়ে আমবাগানে আশ্রয় নেন। ক্লাইভ কিছুটা বিচলিত হয়ে পড়েন। তিন ঘন্টা যুদ্ধের পর ক্লাইভ বুঝতে পারেন বিজয় তো দূরের কথা, সমূলে ধবংশ হবার সম্ভবনাই বেশি। ফলে, তিনি তার বাহিনী নিয়ে পিছু হটে আম বাগানে প্রবেশ করতে আরম্ভ করেন। সাহসী সেনাপতি মীরমদন একদল অশ্বারোহী সৈন্যসহ ধাবিত হন ইংরেজ বাহিনীর পিছু। ঐতিহাসিকদের মতে সে সময় ইংরেজ বাহিনীর পরাজয় অনিবার্য হয়ে উঠেছিল। মীরমদন ধীরে ধীরে অগ্রসর হচ্ছিলেন। কিন্তু মীরজাফর, ইয়ার লতিফ, রায় দুর্লভ যেখানে সৈন্যসমাবেশ করেছিলেন সেখানেই নিস্পৃহভাবে দাঁড়িয়ে থাকলেন। তাঁদের সামান্য সহায়তা পেলেও হয়ত মীরমদন ইংরেজদের পরাজয় বরণ করতে বাধ্য করতে পারতেন।মীর মদন ও মোহন লালের অধীনস্থ সৈন্যদের ক্লাইভের নেতৃত্বাধীন ইংরেজ সৈন্যের মোকাবেলায় এগিয়ে গেলে তাতেই ক্লাইভ রণে ভঙ্গ দিতে বাধ্য হন।দুপুরের দিকে হঠাৎ বৃষ্টি নামলে সিরাজদ্দৌলার গোলাবারুদ ভিজে যায়। তবুও সাহসী মীরমদন ইংরেজদের সাথে লড়াই চালিয়ে যেতে লাগলেন। কিন্তু হঠাৎ করেই গোলার আঘাতে মীরমদন মারাত্বক ভাবে আহত হন।
মীর মদন মারাত্মকভাবে আহত হওয়ার সংবাদে ব্যাকুল হয়ে সিরাজ-উদ-দৌলা মীর জাফরকে ডেকে তার পদতলে উষ্ণীষ রেখে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করার আবেদন জানান। মীর জাফর সেদিন নবাবকে যুদ্ধে বিরতি দেবার পরামর্শ দেন। রায় দুর্লভ তাকে মুর্শিদাবাদ যেতে বলেন। নবাব মোহন লালকে আক্রমণ থামানোর নির্দেশ দেন।
মীরমদনের পতনের পরেও অন্যতম সেনাপতি মোহনলাল যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি যুদ্ধবিরতির বিরুদ্ধে গিয়ে ইংরেজবাহিনী কে আক্রমণের পক্ষপাতী ছিলেন। নবাবের বারংবার আদেশে বিরক্ত হয়ে মোহন লাল আক্রমণ বন্ধ করলে নবাব সৈন্যদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়, এই সুযোগে ইংরেজ বাহিনী নবাব বাহিনীর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের সুসজ্জিত বাহিনী ইংরেজদের কোনো প্রকার বাধা না দিয়ে নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকে। কেবল ফরাসী সেনাপতি সিনফ্রে নিজের স্বল্পসংখ্যক সেনানী নিয়ে ইংরেজদের বাধা প্রদান করতে থাকেন। কিন্তু তিনি একা ইংরেজদের গতিরোধ করতে পারলেন না। অপরাহ্ন পাঁচটার সময় ইংরেজ বাহিনী নবাবের পরিখাবেষ্টিত শিবির অধিকার করে নেয়। নবাব অবশ্য ইতিপূর্বেই মুর্শিদাবাদ রওনা হয়ে যান। এভাবে পলাশী যুদ্ধ বিকেল পাঁচটায় শেষ হয় এবং নবাবের ছাউনি ইংরেজদের অধিকারে আসে। ইংরেজদের পক্ষে সাতজন ইউরোপিয়ান এবং ১৬ জন দেশীয় সৈন্য নিহত হয়। মীরজাফরের পরামর্শে নবাব রাজধানী রক্ষা করার জন্য দুই হাজার সৈন্য নিয়ে মুর্শিদাবাদের উদ্দেশ্যে রওনা দেন। কিন্তু রাজধানী রক্ষা করার জন্যও কেউ তাঁকে সাহায্য করেনি। সিরাজদ্দৌলা তাঁর সহধর্মিণী লুৎফুন্নেসা ও ভৃত্য গোলাম হোসেনকে নিয়ে রাজধানী থেকে বের হয়ে স্থলপথে ভগবানগোলায় পৌঁছে যান এবং সেখান থেকে নৌকাযোগে পদ্মা ও মহানন্দার মধ্য দিয়ে উত্তর দিক অভিমুখে যাত্রা করেন। তাঁর আশা ছিল পশ্চিমাঞ্চলে পৌঁছাতে পারলে ফরাসি সৈনিক মসিয়ে নাস-এর সহায়তায় পাটনা পর্যন্ত গিয়ে রামনারায়ণের কাছ থেকে সৈন্য সংগ্রহ করে ফরাসি বাহিনীর সহায়তায় বাংলাকে রক্ষা করবেন।
মীরজাফর রাজধানীতে পৌঁছে নবাবকে খুঁজে না পেয়ে চারদিকে লোক পাঠালেন। ১৭৫৭ সালের ৩ জুলাই সিরাজদ্দৌলা মহানন্দা নদীর স্রোত অতিক্রম করে এলেও তাতে জোয়ার ভাটার ফলে হঠাৎ করে জল কমে যাওয়ায় নাজিমপুরের মোহনায় এসে তাঁর নৌকা চড়ায় আটকে যায়। তিনি নৌকা থেকে নেমে খাবার সংগ্রহের জন্য একটি মসজিদের নিকটবর্তী বাজারে আসেন। সেখানে কিছু লোক তাঁকে চিনে ফেলে অর্থের লোভে মীর কাশিমের সৈন্যবাহিনীকে খবর দেয়।এ সম্পর্কে ভিন্ন আরেকটি মত আছে যে এক ফকির এখানে নবাব কে দেখে চিনে ফেলে। উক্ত ফকির ইতঃপূর্বে নবাব কর্তৃক শাস্তিপ্রাপ্ত হয়ে তার এক কান হারিয়েছিল। সেই ফকির নবাবের খবর জানিয়ে দেয়। তারা এসে সিরাজদ্দৌলাকে বন্দি করে রাজধানী মুর্শিদাবাদে পাঠিয়ে দেয়। বন্দী হবার সময় নবাবের সাথে ছিলেন তার স্ত্রী লুতফা বেগম এবং চার বছর বয়সী কন্যা উম্মে জহুরা।কথিত আছে নবাবকে প্রকাশ্য রাস্তায় হাতকড়া পড়িয়ে রাস্তার দুপাশে হাজার হাজার মানুষের চোখের হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল , সেদিন মুর্শিদাবাদ বাসীর থেকে ন্যুনতম প্রতিবাদটুকু ও শোনা যায়নি ।
জাফরগঞ্জ প্রাসাদ, যা নিমকহারাম দিউড়ী বলে পরিচিত, সেখানকার একটি কক্ষে সিরাজকে হত্যা করা হয়েছিল। ইতিহাস বলে, সিরাজকে আটক করার পর জাফরগঞ্জ প্রাসাদে এনে রাখা হয়। ২ জুলাই ১৭৫৭ সালের গভীর রাতে মোহাম্মদী বেগ ওই কক্ষে প্রবেশ করে এবং অস্ত্রের আঘাতে হতভাগ্য নবাবের দেহ ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এই মোহাম্মদী বেগই প্রতিপালিত হয়েছিল আলীবর্দীর কাছে।
সিরাজকে হত্যার পর মীরনের নির্দেশে তার দেহ হাতির পিঠে চড়িয়ে সমস্ত মুর্শিদাবাদ ঘোরানো হয়। এরপর লাশ ফেলে দেয়া হয় মুর্শিদাবাদ শহরের রাস্তার পাশে আবর্জনা স্তুপের কাছে। মীরন নির্দেশ দেয় ওই লাশ যেন কেউ সৎকার না করে। কিংবা ওখান থেকে সরিয়ে না নেয়। মীরনের ভয়ে সেদিন কেউ লাশের পাশে যেতে পারেনি। কিন্তু একজন ছিলেন ব্যতিক্রম। মীর্জা জয়নাল আবেদীন তার নাম। অত্যন্ত সম্মানীয় ব্যক্তি। মুর্শিদাবাদের সবাই তাকে সমীহ করতেন। রাজনীতির সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন না।
মীর্জা জয়নাল আবেদীন সিরাজের নৃশংস হত্যাকান্ডে ব্যথিত হন। আরও ব্যথিত হন তার লাশ সৎকার না করায়। তিনি ছুটে যান মীরজাফরের কাছে। তাকে বলেন, ‘মীরজাফর, তোমার যা উদ্দেশ্য ছিল তা সফল। তুমি অনন্ত সিরাজের লাশটি আমাকে সৎকার করতে দাও।’ জয়নাল আবেদীন সিরাজের লাশ ভাগীরথীর জলে স্নান করিয়ে কাফন পরিয়ে ভাগীরথী নদীর ওপারে (পশ্চিমে) খোশবাগে নিয়ে যান। প্রাণ ভয়ে সেদিন জানাজাতেও কেউ অংশ নিতে পারেনি। জয়নাল আবেদীন সন্তানের মতো অত্যন্ত যত্ন সহকারে খোশবাগে আলীবর্দীর কবরের পাশে সিরাজের লাশ সমাহিত করেন।
আমি ইতিহাসবিদ নই ,ইতিহাস পড়তে ভালোবাসি, ফেসবুকে আমার বন্ধুতালিকায় অনেক সম্মানীয়/সম্মানীয়া অধ্যাপক/অধ্যাপিকা,শিক্ষক/শিক্ষিকা, ইতিহসবিদ,ও অনেক প্রাজ্ঞ ও বিদগ্ধজন আছেন, আপনাদের কাছে আমি একটি বিষয় জানতে আগ্রোহী, যা এই সময়ের ইতিহাসের কথা পড়তে গেলেই আমার মনে হয় , অনুগ্রহ করে কেউ যদি আলোকপাত করেন ,কৃতজ্ঞ থাকব।
বিষয় গুলি হল ...।।
১)নবাব আলীবর্দির পর কি কারনে ঘরে বাইরে সবাই সিরাজ বিরোধী হয়ে উঠলেন , সবার এই রাগ ও ক্ষোভের কারন টা কি ?
একটি রাজ্যের সবাই বিশ্বাসঘাতক, এটা মেনে নেওয়া বেশ কষ্টকর, যদি তর্কের খাতিরে তাই মেনে নেওয়া হয়, কোন জাদু মন্ত্রবলে বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ঘরে বাইরে , সবাইকে নিজের দিকে নিতে পেরেছিল।
২) বাংলা বিহার উড়িষ্যার নবাব সিরাজ কেন সব ছোট রাজা ,জমিদার, ও সারা রাজ্যের বিভিন্ন শক্তির আস্থা অর্জন করতে পারেন নি, কি সেই রহস্য ?
৩)ইতিহাস বলে পলাশীর যুদ্ধ যাত্রাপথে ক্লাইভ বেশ কয়েকটি জায়গায় বিশ্রাম ও সহযোগিতা নিয়েছিলেন, যেমন বলাগড, পাটুলি, কাটোয়া প্রভৃতি , নবাবের খাসতালুকেই নবাবের প্রতি এই অনাস্থার কারন কি ?
৪)একমাত্র মীরজাফর, ইয়ার লতিফ ,জগতশেঠ রা ছাড়া সবাই অশিক্ষিত, মূর্খ এটা মেনে নেওয়া যায় না , তবে পলাশীর যুদ্ধ ক্ষেত্রে বিশ্বাসঘাতক সেনাপতিদের অধীনস্থ এত সেনাপ্রধান, কমান্ডার, ও সেনাদের মধ্যে বিদ্রোহের আঁচ ( যখন দেশের স্বাধীনতা বিপন্ন হতে চলেছে) দেখতে পাওয়া যায়নি কেন ?
৫) পলাশীর যুদ্ধবিরতি করে সিরাজ যখন রাজধানী তে ফিরে এলেন তখন তাঁর সাথে দুই হাজারের অ কিছু বেশী সেনা ছিল , তার সাথে রাজধানী তেও তো কিছু সেনা ছিলই, সাথে যুদ্ধ থেকে ফেরা নবাব পক্ষের কিছু সেনাও( মীরমদন,মোহনলাল ও ফরাসী সেনা) ছিল , অপরদিকে ইংরেজ বাহিনীর ছিল মোট ২২০০ সেনা তার মাধ্যে বেশ কিছু পলাশীর যুদ্ধে হতাহত হয়েছিল । এত সেনা নিয়ে সিরাজ রাজধানী রক্ষা না করে পালিয়ে যাবার চেষ্টা করলেন কেন ? আমার ধারনা নবাবের বেতনভোগী প্রায় ৭৫ হাজার সেনাদের কিছু অংশ নিশ্চয়ই তাদের সেনাপতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করে দেশের স্বাধীনতা রক্ষা করতে নবাবের সাথে যোগ দিত ।
৬) শোনা যায় সিরাজ কে গ্রেপ্তার করে প্রকাশ্য দিবালোকে হাতকড়া পরিয়ে সড়কপথে হাঁটিয়ে যখন মুর্শিদাবাদ আনা হয়েছিল তখন রাস্তার দুই পাশে হাজার হাজার লোক দাঁড়িয়ে দেখেছিল, আমার প্রশ্ন হল তারা তো সাধারন, গ্রামের বা নগরের মানুষ , তাদের নবাবের এই করুন অবস্থা দেখে তাদের মনে রাগ,ক্ষোভ,বিদ্রোহ দেখা দিল না কেন ?
চীরকাল ই বাঙালি হল আবেগপ্রবন জাতি,এই পরিস্থিতিতে বাঙালীর সেই আবেগ কোথায় গিয়েছিল ?
আমি যতদূর পরেছি তাতে আমার মনে হয়েছে নবাব সিরাজ কে নিয়ে লিখতে গিয়ে ইতিহাসের গবেষক লেখক রা আড়াআড়ি ভাবে বিভক্ত , অনেক গবেষক/লেখক/ ঐতিহাসিক মনে করেন , হতভাগ্য নবাব সিরাজ ছিলেন অত্যন্ত নিষ্ঠুর উদ্ধত, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা হীন এক জন ।
আবার আর এক দল গবেষক মনে করেন , নবাব সিরাজ ছিলেন, ধর্মপ্রাণ, সাহসী ,প্রজাপালক একজন নবাব, সিরাজের বিরুদ্ধে যা কিছু লেখা হয়েছে তা ইংরেজ ও মিরজাফরের চাটুকার ঐতিহাসিক দের ই লেখা । আমি পরবর্তী পর্বে এই বিষয়ে দু একটি কথা বলার ইচ্ছা জানিয়ে আজকের পর্ব শেষ করলাম । সবাই ভালো থাকুন, সাথে থাকুন ।

Comments

  1. আমিও একজন ছোটখাটো লেখক কিন্তু আমি আমার লেখা গুলো পাব্লিসিটি করতে পারছিনা।

    ReplyDelete
  2. সিরাজের পূর্বকীর্তি সম্বন্ধে যা এখানে বলা আছে দে সম্বন্ধে তথ্যসূত্র পেলে খুশী হতাম।

    ReplyDelete
  3. সিরাজের পূর্বকীর্তি সম্বন্ধে যা এখানে বলা আছে সে সম্বন্ধে তথ্যসূত্র পেলে খুশী হতাম।

    ReplyDelete

Post a Comment

Popular posts from this blog