বাংগালী জাতির উৎপত্তির ইতিকথাঃ-
প্রথম পর্বের পর....

গঙ্গারিডাই বা গাংগেরী সভ্যতা।
(ভারতবর্ষের এক প্রাচীনতম সভ্যতা)
মনে করা হয় এনারাই হলেন আজকের বাংগালীর আদিপুরুষ।
প্রথমেই একটা কাল্পনিক গল্প বলার চেষ্টা করি।

আজ থেকে প্রায় দুই হাজার তিনশত
বছর আগের এক রোদ্রজ্জল ঝলমলে সকালে জনা বিশেক যুবক ঘোড়ায় চড়ে এগিয়ে যাচ্ছে উত্তর পূর্ব দিকে। এই ঘোড় সওয়ার দলের নেতা পদ্মানন্দ। মাত্র পঁচিশ বৎসর বয়স, কিন্তু এরই মধ্যে দেশের মানুষের কাছে তার সাহসিকতা, ও বীরত্বের কাহিনী কিংবদন্তীর রূপ পেয়েছে। অশ্ব চালনা, মল্লযুদ্ধ থেকে শুরু করে মহামত্যের রাজশক্তির সাথে লড়াই, সব কিছুতেই সে অপরাজেয়। পদ্মানন্দ ক্ষৌরকার পিতার সন্তান। তার সতীর্থরাও কামার, জেলে বা কৃষকের ঘরের। তাদের সবার বাড়ি শিবপুর  ও তার আশে পাশের গ্রামে। তাদের পথে নামা, পরাধীন দেশ মাতার দাসত্বের শৃংখল ভাংগার লক্ষ্যে।

বহিরাগত আর্যশক্তি প্রায় সমগ্র ভারত পদানত করে ফেললেও, এই নদ নদী গাছ লতা পাতায় ভরা সুজলা সুফলা শস্যে শ্যামলা মাটির সন্তানেরা বহুকাল ব্যর্থ করে দিয়েছিল তাদের আক্রমন। কিন্তু একসময় পরাস্ত হতে হয় তাদের। এরপর শুরু কয়েক শতাব্দীর লাঞ্চনার অমানিশা। বিজয়ী আর্য শক্তি দেশের সব মানুষকে দাসে পরিণত করে, বেধে দেয় তাদের জন্য নীচু বর্ণ ও পেশা।

এ অভিযাত্রায় পদ্মানন্দ ও তার দল গোপনে সারা দেশ থেকে স্বাধীণতার যোদ্ধা সংগ্রহ করছে। এ পর্যন্ত যে জায়গায় গিয়েছে সবখানেই অভূতপূর্ব সাড়া পাওয়া গেছে। হাজার হাজার অকুতোভয় যুবক এক কথায়ই দলে যোগ দিয়েছে।

এভাবে কিছুদিনের মধ্যে সারাদেশ থেকে নিবেদিত প্রাণ, অমিত তেজী, সাহসী লোক নিয়ে এক বিদ্রোহি বাহিনী গঠিত হয়ে যায়।

তারপরের ঘটনা এক অভূতপূর্ব বিজয়ের কাহিনী। পদ্মানন্দের নেতৃত্বে বিদ্রোহি বাহিনী দখলদার সৈন্যের উপর ঝাপিয়ে পরে। বছর খানেকের মধ্যে প্রায় সমগ্র দেশ থেকে বিদেশি শক্তি পরাজিত হয়ে বিতাড়িত হয়। দেশের মানুষের সমর্থন ও অকুতোভয় অমিততেজী যোদ্ধা বাহিনী নিয়ে পদ্মানন্দ এগিয়ে যায় রাজ শক্তির শেষ ক্ষমতা কেন্দ্র পুন্ড্র নগরে আঘাত হানতে।

রাজ শক্তির সব প্রতিরোধ তাসের ঘরের মত উড়িয়ে দিয়ে বিজয়ী বীর পদ্মানন্দ তরুণ রাজা হিসাবে সিংহাসনে বসেন। স্বাধীন দেশের নাম হল গঙ্গাঋদ্ধি এবং পদ্মানন্দের বাড়ির কাছের নগর গাঙ্গে হল রাজধানী। বর্ণ প্রথা বিলোপ করা হল।

সেই সাথে দেশের মানুষ ফিরে পেল স্বীয় যোগ্যতা অনুসারে সকল কর্মের অধিকার। দূর হয় কয়েক শতাব্দীর দাসত্বের অমানিশার অন্ধকার।

পরাজিত শক্তি পাটলিপূত্র (বর্তমান বিহার অঞ্চলে অবস্থিত) থেকে বার কয়েক আক্রমন করে ব্যর্থ হয়ে কলিঙ্গ সহ কয়েকটি আর্য রাজ্যের সাথে জোট করে গঙ্গাঋদ্ধি কে একযোগে আক্রমন করে। দেশের সেনাবাহিনী প্রস্তুত ছিল। রক্তক্ষয়ী এ যুদ্ধে পদ্মানন্দের কাছে আর্য রাজ্য সমূহের সম্মিলিত জোট শোচনীয় ভাবে পরাস্ত হয়।

এরপর পদ্মানন্দ জোটবদ্ধ আক্রমনকারী রাজ্যসমূহ দখল করে স্বীয় রাজ্যে অন্তর্ভূক্ত করে নেন। পদ্মানন্দ ও তার পূত্র ধনানন্দ অপ্রতিরোধ্য অপরাজেয় এক বিশাল সেন্যবাহিনী গড়ে তোলেন। বাইরের কোন শক্তির কাছে যে সেন্যবাহিনী কোনদিন পরাজিত হয় নাই। বাঙালি মায়ের সন্তান নাপিত পূত্র পদ্মানন্দ কর্তৃক প্রতিষ্ঠিত গঙ্গাঋদ্ধি হয়ে উঠে প্রভূত ধন সম্পদে পরিপূর্ণ, পৃথিবীর সর্ববৃহত ও সর্বশ্রেষ্ঠ সেনাবাহিনীর অধিকারি এক বিশাল পরাক্রমশালী সাম্রাজ্য।

ধনানন্দের রাজত্বকালে দিগ্বিজয়ি গ্রিক সম্রাট আলেকজান্ডার সুদূর গ্রিস থেকে একের পর এক রাজ্য জয় করে ইরান আফগানিস্তান হয়ে ভারতের পাঞ্জাবে পৌছে যায়। সুদর্শন তরুণ সম্রাটের চোখে সারা পৃথিবী জয়ের স্বপ্ন। পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তিশালি সেনাবাহিনীর অধিকারি তিনি। বিখ্যাত ইরান সম্রাট দারায়ুস থেকে শুরু করে উত্তর পশ্চিম ভারতের পারক্রমশালী রাজা পুরু পর্যন্ত কেউ তার সামনে দাড়াতে পারে নাই। এখন তার সামনে মাত্র একটা বাধা, বিপাশা নদীর ওপারের রাজ্য। ভারতের মূল ভুখন্ড। এটুকু করতলগত হলেই সমগ্র ভারত তার দখল হয়ে গেল। যে স্বপ্ন নিয়ে নিয়ে যাত্রা শুরু করেছিলেন গ্রিক রাষ্ট্র মেসিডোনিয়া থেকে, তা পরিপূর্ণতা পাবে।

এদিকে ধনানন্দের সেনাবাহিনী আলেক্সান্ডারের বাহিনী কে প্রতিহত করতে বিপাশার এ পাড়ে সৈন্য সমাবেশ করে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম দুই সৈন্য বাহিনী বিপাশা নদীর দুই পাড়ে যুদ্ধের জন্য অপেক্ষামান। নদী পার হওয়ার পূর্বে অপর পক্ষের খবর নিতে চাইলেন আলেক্সান্ডার।

বিজিত স্থানীয় ছোট ছোট ভূস্বামীরা আলেকজান্ডারকে জানাল অপর পাড়ের দেশটির ঐশ্বর্যের কথা, অপরাজেয় সৈন্যবাহিনীর কথা।
- দুই লক্ষ সৈন্যের বিশাল এক অপরাজেয় পাদাতিক বাহিনী।
সম্রাটকে একটু চিন্তিত মনে হলো।
- বিশ হাজার সুসজ্জিত অশ্বারোহী বাহিনী। দুই হাজার রথ।
একটু যেন দমে গেলেন গ্রিক বীর, 'বলো কি?'
'আরো আছে প্রভু'।
- কমপক্ষে তিন হাজার হাতির গজ বাহিনী।
'তিন হাজার হাতি!', যেন হাহাকার করে উঠলেন প্রায় সারা পৃথিবী তছনছ করা মেসিডোনিয়ার বীর।
- জ্বি হুজুর কমপক্ষে।

স্তম্ভিত হয়ে গেলেন সম্রাট। তার কল্পনাতেও ছিলনা ভারতে এত বড় শক্তিশালী সম্রাজ্য আছে। সামনে এগিয়ে যাওয়া মানে নিশ্চিতভাবে সমূলে ধ্বংস হওয়া, আবার ব্যর্থ হয়ে ফিরে যাওয়াও তার মত দ্বিগ্গিজয়ী বীরের জন্য অপমানজনক। এরপর পৃথিবী বিখ্যাত এ অসীম সাহসী বীর করণীয় আলোচনার জন্য নিজের সেনাবাহিনীর সাথে পরামর্শে বসলেন। বিচক্ষণ সেনাপতি সৈন্যদের পক্ষ হয়ে জানাল সৈন্যরা কেউ বিপাশা পার হয়ে নিজের জীবন দিয়ে আসতে রাজী নয়। অসহায় সম্রাটের সামনে
এসে শত শত যুদ্ধ বিজয়ের পরিকল্পনাকারী, পৃথিবী শ্রেষ্ঠ দক্ষ সেনাপতির স্পষ্ট উচ্চারণ,
- হুজুর, এটা হবে নিছক আত্মহত্যা আর কিছু নয়।

ফলে পাঞ্জাবের বিপাশা নদীর অপর পাড়েই আলেক্জান্ডারের বিজয় রথ থেমে যায়। সম্পূর্ণ ভারত জয়ের স্বপ্ন তার স্বপ্নই রয়ে গেল। এরপর গ্রিক বাহিনী মেসিডোনিয়ার দিকে ফিরতি যাত্রা করে।

খ্রিষ্টপূর্ব প্রথম ও দ্বিতীয় শতাব্দীর দিকে প্রাচীন বাংলার একটি জাতি গোষ্ঠী। গ্রিক এবং ল্যাটিন লেখকদের লেখা থেকে এই জাতি সম্পর্কে জানা যায়। বিভিন্ন লেখক এই জাতিকে নানান বানানে উল্লেখ করেছেন। এই নামগুলো হলো গঙ্গারিডে (Gangaridae), 'গঙ্গারিদুম' (Gangariridum) ও 'গঙ্গারাইডেস' (Gangarides)।

খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৭ অব্দে হিন্দুকুশ পর্বত অতিক্রম করে আলেকজান্ডার ভারতের দিকে যাত্রা করেন। আর খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৬ অব্দে আলেকজান্ডার সিন্ধু নদ পার হয়ে তক্ষশীলায় প্রবেশ করেন।  আলেকজান্ডারের সময়ে ভারতে আগত গ্রিক ঐতিহাসিকরা গঙ্গারিডাই নামক একটি শক্তিশালী রাজার কথা উল্লেখ করেছেন। এই জাতি সম্পর্কে গ্রিক ও ল্যটিন লেখকদের যে বিবরণ পাওয়া যায়, তা হলো−

'গঙ্গারিডাই রাজ্যের বিশাল হস্তী-বাহিনী ছিল। এই বাহিনীর জন্যই এ রাজ্য কখনই বিদেশী রাজ্যের কাছে পরাজিত হয় নাই। অন্য রাজ্যগুলি হস্তী-বাহিনীর সংখ্যা এবং শক্তি নিয়ে আতংকগ্রস্ত থাকিত'।..."গঙ্গার শেষ অংশের প্রস্থ ৮ মাইল, এবং যেখানে এটি সবথেকে কম প্রস্থের সেই স্থানে এর গভীরতা প্রায় ১০০ ফুট। সেই মানুষরা যারা সেই সুদুর প্রান্তে থাকেন তারা হলেন গঙ্গারিডাই। এদের রাজার ১০০০ অশ্বারোহী, ৭০০ হস্তি এবং ৬০০০০ পদাতিক সৈন্য নিয়ে সজ্জিত সেনাবাহিনী আছে " - মেগাস্থিনিস (৩৫০-২৯০ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ ) আলেকজান্ডারের সেনাপতি ও বন্ধু সেলুকাসের রাজত্বকালে গ্রিক দূত হিসাবে ভারতে এসেছিলেন।
'ভারতের সমূদয় জাতির মধ্যে গঙ্গারিডাই সর্বশ্রেষ্ঠ। এই গঙ্গারিডাই রাজার সুসজ্জিত ও যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত চার হাজার হস্তী-বাহিনীর কথা জানিতে পারিয়া আলেকজান্ডার তাহার বিরূদ্ধে যুদ্ধে অবতীর্ণ হইলেন না' - ডিওডোরাস (৯০-৩০খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দ)
‘গঙ্গা নদী উত্তর হতে দক্ষিণ দিকে প্রবাহিত এবং গঙ্গারিডাই রাজ্যের পূর্ব সীমানায় সমূদ্রে মিলিত হইয়াছে।’ - মেগাস্থিনিস
‘গঙ্গা নদীর মোহনায় সমূদয় এলাকা জুড়িয়া গঙ্গারিডাই রাজ্য’ -টলেমি
‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভিতর দিয়া গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হইয়াছে’- প্লিনি
টলেমি গঙ্গারিডাই- এর অবস্থান সম্পর্কে জানা যায়, গঙ্গার পাঁচটি মুখ সংলগ্ন প্রায় সমূদয় এলাক গঙ্গারিডাইরা দখল করে রেখেছিল। ‘গাঙ্গে’ নগর ছিল এর রাজধানী। তার বর্ণনাকৃত চারটি দ্রাঘিমা ডিগ্রি সমূদ্র উপকূলের সর্ব পশ্চিম থেকে সর্ব পূর্ব নদীমুখ পর্যন্ত অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত করছে। কার্যতঃ এর অর্থ হলো ‘গঙ্গারিডাই’ বঙ্গপোসাগরের উপকৃলবর্তী গঙ্গার সর্বপশ্চিম এবং সর্বপূর্ব নদীমুখ পযর্ন্ত বিস্তৃত ছিল। লক্ষ্য করা যায়, ভাগীরথীর (তমলুক এর নিকটে) এবং পদ্মার (চট্টগ্রামের নিকটে) নদীমুখের দ্রাঘিমা রৈখার পার্থক্য ৩৫ ডিগ্রির সামান্য কিছু বেশি। তাই টলেমির তথ্যানুযায়ী গঙ্গারিডাই-কে শনাক্ত করা যায় বর্তমান ভারতের পশ্চিমবাংলা ও বাংলাদেশে গঙ্গার প্রধান দুটি শাখার মধ্যবর্তী অঞ্চলটিতে।

জনৈক গ্রিক নাবিক তাঁর Periplous tes Erythras Thalasses (Periplus Maris Erythraei) গ্রন্থে বঙ্গোপসাগর সংলগ্ন উড়িষ্যা উপকূলের পূর্বে অবস্থিত গাঙ্গে দেশের কথা উল্লেখ করেছেন। তাঁর মতে- নদীর নামে গাঙ্গে ছিল একটি বাণিজ্য শহর।

গঙ্গারিডাই শব্দের উৎপত্তি গঙ্গারিড থেকে। ধারণা করা হয় গঙ্গারিড ভারতের গঙ্গাহৃদ বা গঙ্গাহৃদি শব্দের গ্রিক রূপ। অর্থাৎ গঙ্গা হৃদয়ে যার - যে ভূমির বক্ষে গঙ্গা প্রবাহিত। ঐতিহাসিক অতুল সুরের মতে গঙ্গাহৃদ থেকে গঙ্গারিডি তার থেকে গঙ্গারাঢ়ি ও তার থেকে রাঢ় শব্দটি এসে থাকতে পারে। প্রখ্যাত ঐতিহাসিক নীহারঞ্জন রায় তাঁর বাঙালির ইতিহাস (আদি পর্ব) গ্রন্থে লিখেছেন- ‘গঙ্গারিডাই-রা যে গাঙ্গেয় প্রদেশের লোক এ সম্বন্ধে সন্দেহ নাই, কারণ গ্রিক লাতিন লেখকরা এ সম্বন্ধে একমত। দিয়োদারাস-কার্টিয়াস-প্লুতার্ক-সলিনাস-প্লিনি-টলেমি-স্ট্ট্যাবো প্রভৃতি লেখকদের প্রাসঙ্গিক মতামতের তুলানামূলক বিস্তৃত আলোচনা করিয়া হেমচন্দ্র রায় চৌধুরী মহাশয় দেখাইয়াছেন যে গঙ্গারিডাই বা গঙ্গারাষ্ট্র গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্বতীরে অবস্থিত ও বিস্তৃত ছিল।’

প্লিনির মতে ‘গঙ্গারিডাই রাজ্যের ভিতর দিয়ে গঙ্গা নদীর শেষ অংশ প্রবাহিত হয়েছে । গঙ্গার দক্ষিণ অংশের অধিবাসীদের গাত্রবর্ণ ছিলো কালো এবং রৌদ্রে পোড়া, কিন্তু তারা ইথিওপিয়ানদের মতো কালো ছিল না।’ এই বিবরণ থেকে অনুমান করা যায়- এরা ছিল নেগ্রিটো, প্রোটো-অস্ট্রালয়েড ও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর মিশ্র জাতি।

 উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলায় এবং কলকাতা শহর থেকে ৩৫ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব দিকে একদা ভাগীরথী নদীর অন্যতম প্রবাহ পদ্মা নদী (বর্তমানে অবলুপ্ত) ও বিদ্যাধরী নদীর কূল ঘেঁষে  গংগারিডাই রাজ্যের রাজধানীর অবস্থান ছিল বলে মনে করা হয়।
 এখানকার দেগঙ্গা (এটি দেবগঙ্গা, দ্বীপগঙ্গা বা দীর্ঘগঙ্গা নামের অপভ্রংশ) গ্রামের রাজপথের সমান্তরালে এক প্রবাহিত নদীর (পদ্মা) শুষ্কখাত এখনো দেখা যায়। এই প্রত্নস্থলটি আনুমানিক ৪০০ থেকে ৮০০ খ্রিস্টপূর্বে গড়ে উঠেছিল।

চন্দ্রকেতুগড়

প্রত্নস্থলটিতে বিভিন্ন সময়ে একাধিকবার উৎখনন পরিচালিত হয়েছে। উৎখননে প্রাপ্ত প্রত্নসামগ্রী চন্দ্রকেতুগড়ের প্রাচীনত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব প্রমাণ করে।
এখানকার নিদর্শনাবলির প্রধান অংশ কলকাতার আশুতোষ সংগ্রহশালা ও প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া বেশ কিছু নিদর্শন শহর এবং শহরের বাইরে ব্যক্তিগত সংগ্রহেও রয়েছে। চন্দ্রকেতুগড়ে প্রাপ্ত পঞ্চচূড় অপ্সরা, নগরশ্রেষ্ঠীর ও গজদন্ত শিল্প ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নামি সংগ্রহালয়ে রয়েছে।

প্রত্নস্থলটিতে বর্তমানে দেবালয়, হাদীপুর, বেড়াচাঁপা, শানপুকুর, ঝিক্‌রা ও ইটাখোলা গ্রামের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে প্রাচীন নগর-বসতির চিহ্ন পাওয়া যায়। মাটির তৈরি বিশাল দুর্গপ্রাচীর প্রত্নস্থলটির মূল কেন্দ্র ঘিরে আছে; যা আকৃতিতে আয়তাকার এবং মোটামুটিভাবে এক বর্গমাইল এলাকা জুড়ে বিস্তৃত। মাটির তৈরি এই দুর্গপ্রাচীরের অভ্যন্তরেই চন্দ্রকেতুগড়, খনা-মিহিরের ঢিবি, ইটাখোলা এবং নুনগোলা ইত্যাদি স্থানে খননের মাধ্যমে প্রাচীন ভারতের নগর-সভ্যতার পাঁচটি পৃথক সাংস্কৃতিক স্তর বা পর্বের সন্ধান পাওয়া গেছে।

স্থানটির "খনা-মিহিরের ঢিবি" অংশের সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় রাজা বিক্রমাদিত্যের সভারত্ন বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ বরাহমিহির এবং তাঁর পুত্রবধূ খনার নাম যুক্ত; লোকপ্রবাদ যে, এখানেই খনা ও বরাহমিহিরের বাসস্থান ছিল। এছাড়া, এখানে "দেবালয়"-এর রাজা চন্দ্রকেতুর নামে একাধিক কিংবদন্তী প্রচলিত আছে ।

বিভিন্ন ঐতিহাসিকদের মতে, চন্দ্রকেতুগড়ই ছিল সম্ভবত ‘পেরিপ্লাস’ এবং টলেমি সূত্রে উল্লিখিত বিখ্যাত প্রাচীন সমুদ্র-বন্দর 'গঙ্গারিডাই'-এর রাজধানী বা 'গাঙ্গে' বন্দর। এই প্রত্নস্থলটির সঙ্গে জলপথে প্রাচীন ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল বিশেষত রোমের বাণিজ্যিক যোগসূত্রের সুনিশ্চিত প্রমাণ মিলেছে।
সূত্র :
ভারতের ইতিহাস। অতুল চন্দ্র রায়, প্রণবকুমার চট্টোপাধ্যায়।
বাংলা বিশ্বকোষ। চতুর্থ খণ্ড। নওরোজ কিতাবিস্তান। নভেম্বর ১৯৭৬ ও উইকিপিডিয়া।

Comments

Popular posts from this blog

বেইমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের শহর মুর্শিদাবাদ......