বাঙালি জাতির উৎপত্তির ইতিকথা ঃ-

আজ আমারা বাঙালি নামে বিশ্ববিদীত। কিন্তু কয়েক হাজার বছরের আগে আমাদের পরিচয় ছিল বঙ্গো বা ভঙ্গ। কোথা থেকে বঙ্গ বা ভঙ্গ জাতির উৎপত্তি তা সঠিক ভাবে বলা অসম্ভব। কারন এ নিয়ে অনুসন্ধান বা গবেষণা সেভাবে কিছুই হয়নি।

যদিও একটি জীন বা জেনেটিক পরীক্ষার কথা মনে পড়ে গেলো। তা হলো বাঙালিদের সাথে ভূমধ্য সাগরীয় মানুষের জীনগত বৈশিষ্ট্যের মিল।

গুজরাতের ঐতিহাসিকরা দাবি করেন যে, তাদের বং  গোষ্ঠীর লোকজন বঙ্গে বসতি স্থাপন করেছিল। আবার একদল ঐতিহাসিক বলেন যে মগধ থেকে কিছু মানুষ পূর্ব দিকে গিয়ে বঙ্গদেশ তৈরি করেছে। যদিও এই দাবি দুটি অবিশ্বাস্য বলে মনে হয়, কারণ ভারতের ১৬ টি জনপদের বাইরেই বঙ্গকে শুধু ভাবা হতো তা নয়। বঙ্গদেশে কেউ প্রবেশ করলে তাকে গোবর খাইয়ে শুদ্ধিকরন করা হতো।

জার্মান গবেষকদের মতে ভঙ্গ জাতি এবং মিশরীয় জাতির উৎপত্তি একজায়গায়। এব্যাপারে সোলোনের কথা উল্লেখ করতেই হয়। প্রাচীন গ্রিসের এথেন্সের একজন বিশিষ্ট কবি ও আইন প্রবক্তা। সোলোন তার মিশর ভ্রমণের সময় সইস নামক স্থানে নেইথের মন্দির পরিদর্শনে গিয়ে একজন পুরোহিতের কাছ থেকে আটলান্টিস বলে এক ডুবে যাওয়া শহরের কথা জানতে পারেন। এই আটলান্টিস থেকে আদি মিশরীয় জাতির উৎপত্তি।

জার্মান গবেষকরা লক্ষ করে দেখেছিলেন যে বাঙালি ও মিশরীয়দের দৈহিক মিলের সমন্বয়। প্রাচীন মিশরের বহু জায়গার নামের সাথে প্রাচীন বঙ্গের বহু স্থানের নামের সাদৃশ্য। এমনকি বহু আচার বিচারের নিয়ম কানুন, পদ্ধতি ও যন্ত্রপাতি এক।

আবার কিছু ঐতিহাসিক দাবি করেন যে বঙ্গের মানুষেরা ইরানের নিকটবর্তী কোন স্থান যেমন তুরস্ক বা পূর্ব গ্রিসের কোনো জায়গা যেমন বলকান বা ভুমধ্য সাগরীয় এলাকার মানুষ।

এবিষয়ে উল্লেখযোগ্য যে তুরস্কের ভয়াবহ জানে—ঈসার বাহিনী প্রাচীন বাংলার মানুষের বংশধরদের নিয়ে বানানো হয়েছিল। যারা মুলত বলকান ছিল। বাঙালিরা কিন্তু এক হিংস্র জাতি, কেন তা অন্য প্রবন্ধে বলা যাবে।

এবিষয়ে একটি কথা উল্লেখ করতেই হয়, যে বাঙালিরা পাথরের খোদাই শিল্পে পটু। ভারতের বিভিন্ন মন্দির স্থাপনে বাংলার কারিগরদের বিশেষ ভুমিকার উল্লেখ পাওয়া যায়। কিন্তু বাংলার কোথাও তেমন কোন পাথর নেই। এর থেকে একটা কথা পরিস্কার যে বাঙালিরা কোনো পাথুরে অঞ্চলে অনেক দিন ছিল বা তাদের উৎপত্তি হয়েছিল।

বাঙালিরা যুগ যুগ ধরে একটি অত্যধিক গরম অঞ্চলে থাকতে অভ্যস্ত। কিন্তু কেউই তেমন গরম  সহ্য করতে পারে না। তবে কি তারা কোনো ঠান্ডা অঞ্চলের মানুষ?

বাঙালি জাতির লোকেরা কিন্তু সবাই একসাথে আসেননি। যেমন ব্রাহ্মণ, এদের আগমন বৈদিক যুগের পর। কায়স্থদের যারা কুলিন ও কিছু অকুলিন, তারাও বৈদিক যুগের পর এসেছে। কায়স্থদের আট ঘর ও ৭২ ঘর, বেনে এবং নম শুদ্ররা সম্ভবত প্রাচীন বাংলার জনগোষ্ঠী। এদের সাথে কিছু আঞ্চলিক অধিবাসীদের মিশ্রণ ঘটেছিল।

বৈদিক সমাজে কায়স্থদের কোনো উল্লেখ নেই। তবে এরা কারা? মজার ব্যাপার হলো, চিত্রগুপ্ত যে নরকের হিসাব রক্ষক। সে কিন্তু একজন কায়স্থ এবং ব্রহ্মপুত্র। আবার বলা হয় যে পরশুরাম সব ক্ষত্রিয় নিধন করেছিলেন। একজন ক্ষত্রিয় ক্ষাত্র ধর্ম পরিত্যাগ করে কায়স্থ হন। এখানে একটা সমস্যা আছে, সেটা হল কায়স্থরা মুলত বাংলার লোক। ভারতের বেশিরভাগ জায়গায় এরা নগন্য।

এর মানে কায়স্থরা এমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ জাতি। যাদের গুরুত্ব না দিয়েও গুরুত্ব দিতে হয়েছে। তবে কি বৈদিক যুগের আগে এরা ভারত শাসন করতেন? বা এরাই ভারতে বাইরে থেকে আসা প্রথম জাতি?

বাঙালি মুসলমানেরা মুলত বৌদ্ধ ধর্ম থেকে পরিবর্তিত এরা কেউই আরবী বা তুর্কি বংশোদ্ভূত নন। বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীদের মস্তক মুন্ডিত থাকতো। এজন্য চলতি ভাষায় এদের নেড়া বলা হতো। মুসলিম ধর্ম গ্রহণের পর এদের নেড়ে বা লেড়ে বলা হতো। বছর তিরিশ আগের একটা ঘটনার কথা মনে পড়ে গেল। আশেপাশে কোনো জায়গায় একসাথে ১০০০০ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী মানুষ মুসলিম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। অবশ্য অনেক হিন্দুদেরও ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। মুলত সুলতানি শাষনকালে, যেমন দাউদ খাঁ এবং কালাপাহাড়ের সময়। পরে মুঘল শাসনের সময়ও এই ধারা কায়েম ছিল। বিশেষ করে শাহজাহানের পরবর্তী সময়কালে।

এখন অনেক ঐতিহাসিক বলছেন যে সিন্ধু সভ্যতার মানুষজন পূর্বদিকে এসেছিল। তারা কারা? তবে কি তারাই বাঙালি? দক্ষিণ ভারতের লোকজন যে আসলে প্রাচীন বাংলার জনগোষ্ঠীর অংশ তার প্রমাণ পরবর্তী কোন প্রবন্ধে উল্লেখ করা যাবে।

বাংলার ইতিহাসের উল্লেখ, আর আছে মহাভারতে। যদিও ঐতিহাসিকরা মহাভারতকে সত্য বলে ধরেন না। কিছুদিন আগে দিল্লি ও হরিয়ানার কাছে দুটি তাম্র যুগের রথের কাঠামো ও একশোর বেশি কংকাল পাওয়া গেছে। যার আনুমানিক সময় সীমা ৫০০০ বছর। যা মহাভারতের সমসাময়িক।

পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন স্থানে মহাভারতের সমসাময়িক ঐতিহাসিক নিদর্শন ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। এটুকু বলতে পারি যে ওই নিদর্শন যারা বানিয়েছিলেন তারা কেউই বৈদিক ছিলেন না।

বাংলায় বৈদিক যুগের সূচনা আনুমানিক দশম শতকে। এখন বাংলাতে গোত্রহীন কোনো পরিবার বিরল। এটি একটি বৈদিক সংস্কৃতি। যদিও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গোত্রগুলি গুরুর সুত্রে পাওয়া। দশম শতকে বাংলায় এমনভাবে বৈদিকিকরন করা হয়েছিল যে, প্রাচীন বাংলার জনজাতির চিহ্ন গুলি প্রায় মুছে ফেলা হয়েছে।

না আমার বৈদিক ধর্ম নিয়ে কোন রুচি বা অরুচী কোনোটাই নেই। কারন আমি ধর্ম মানি না। কিন্তু কোন জাতির ইতিহাস লিখতে গেলে এই আলোচনা গুলি বাদ দেওয়া অসম্ভব।

আর একটি কথা, বঙ্গ জাতি কিন্তু এখনকার বাংলা ভূখন্ডে এসেছিল সমুদ্র পথে। যাকে বলে সি ফেয়ারিং নেশান। এবিষয়ে উল্লেখযোগ্য যে বাংলার সামুদ্রিক নৌযানের সাথে ভূমধ্য সাগরীয় নৌযানের মিল পাওয়া গিয়েছে।

গ্রীক রুপকথাতে যেশন বলে এক রাজপুত্রের সমুদ্র যাত্রার একটি গল্প আছে। সেখানে বলা হয়েছিল যে তাদের সমুদ্রের উপযুক্ত নৌযান ছিল না। বঙ্গের নাবিকরা তাদের নৌযান সরবরাহ করেছিলেন।

ইউরোপের ও এশিয়া মাইনরের বিভিন্ন প্রান্তে বঙ্গের মানুষজন ভাড়াটে সৈন্য হিসেবে কাজ করতেন। প্রথমে ঐতিহাসিকদের ধারণা ছিল যে আলেকজান্ডারের ভারত অভিযান নেহাতই একটি দুর্ঘটনা। পরে এটা প্রমাণ হয়েছে যে আলেকজান্ডারের তাম্র লিপ্ত বা নিকটবর্তী কোনো বন্দর থেকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা ছিল।

বাঙালির উৎপত্তির কথা বলতে গেলে গঙ্গারিডিদের কথা বলতেই হবে। রাঢ় বঙ্গের গঙ্গা ও পদ্মার অববাহিকায় অবস্থিত একটি প্রাচীন রাজ্য। যারা হস্তি সৈন্যবাহিনী, নৌবানিজ্যে ও নৌযুদ্ধে পারদর্শী ছিলেন। এদের কথা ইউরোপের ইতিহাসে দুইবার উল্লেখ করা হয়েছে। প্রথমবার আলেকজান্ডারের সময়। আর দ্বিতীয়বার ক্লিওপেটরার ও অগাস্টাস সিজারের যুদ্ধের সময়। তাদের বীরগাঁথা অমর হয়ে রয়েছে।

এব্যাপারে উল্লেখযোগ্য যে আলেকজান্ডারের বিশ্ববিজয়ের অভিযান কিন্তু প্রতিহিংসার অভিযান। পারস্যের গ্রিস অভিযানে যে সমস্ত জাতির লোকেরা ধংসের তান্ডব চালিয়েছিল, আলেকজান্ডার বেছে বেছে সেই সমস্ত জাতির নিধন করেছিল। তবে কি গঙ্গারিডিরা গ্রিসে তান্ডবলিলায় অংশগ্রহণ করেছিল?

ক্রমশ...

Comments

Popular posts from this blog

বেইমানী ও বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসের শহর মুর্শিদাবাদ......